হাওর, পাহাড় ও নদীর জনপদ সুনামগঞ্জ। বসন্ত এলেই এই জনপদের প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে ওঠে। আকাশ-জমিন রাঙিয়ে দেয় আগুনরঙা শিমুল ফুল। লাল টুকটুকে শিমুলের ডালে ডালে ফুটে থাকা ফুল আর মাটিতে ঝরে পড়া পাপড়ি যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়—সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী হলেও তার মুগ্ধতা দীর্ঘদিন মনে গেঁথে থাকে। এই অনন্য সৌন্দর্যের টানে শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে মানুষ ছুটে আসে শিমুলের রাজ্যে, খোঁজে একটু প্রশান্তি।
সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলা-এর বাদাঘাট ইউনিয়নের মানিগাঁও গ্রামে অবস্থিত জয়নাল আবেদীনের শিমুলবাগান এখন বসন্তকালের অন্যতম আকর্ষণ। এক পাশে প্রবাহিত যাদুকাটা নদী, অন্য পাশে মেঘালয়ের পাহাড়—এই পাহাড় ও নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আগুনরাঙা শিমুলবাগান প্রকৃতিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রিক সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্র পরিচয়।
বাগানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি শিমুল গাছ, প্রতিটি গাছ যেন লাল ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে। ডালে ডালে পাখির কিচিরমিচির, শিশুদের হাসি আর দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে প্রাণবন্ত এক মিলনমেলায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে বাগান চত্বর।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শিমুল ফুলের এই রূপ প্রায় এক মাস স্থায়ী হয়। এই সময় প্রতিদিনই হাজারো দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ, পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক, তরুণ-তরুণী—সবার উপস্থিতিতে বসন্তকালে বাগানটি যেন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
জানা যায়, প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে প্রায় তিন হাজার শিমুল গাছ নিয়ে ২০০০ সালে বাগানটি গড়ে তোলেন বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বাগানটি বর্তমানে ভাটির জনপদের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এশিয়ার সর্ববৃহৎ শিমুলবাগান হিসেবে পরিচিত এই বাগানটির তত্ত্বাবধান করছেন তার ছেলে রাখাব উদ্দিন।
বাগানে ঘুরতে আসা পর্যটক কামরুল হাসান বলেন, এখানে এসে মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতির একটি জীবন্ত চিত্রপটে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে শুধু লাল শিমুল আর শিমুল—এই দৃশ্য সত্যিই মন ভরে দেয়। ঢাকা থেকে আসা নাদিয়া সুলতানা জানান, পাহাড়, নদী ও শিমুল ফুলের সমন্বয় এক কথায় অসাধারণ। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য এটি দারুণ একটি জায়গা।
তবে অনেক দর্শনার্থী যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছেন। সিলেট থেকে আসা মেহেদী হোসেন বলেন, সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। ভাঙাচোরা পথে দীর্ঘ সময় যাত্রা করতে হয়েছে। নতুন সরকার দ্রুত সড়ক উন্নয়ন করলে এখানে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে। একই মত প্রকাশ করেন আরেক দর্শনার্থী রুমানা আক্তার। তার মতে, এত সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নেই।
শিমুলবাগান ঘিরে স্থানীয়দের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন আয়ের সুযোগও। পর্যটকদের আগমনে আশপাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান ও খাবারের স্টল। এতে অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বসন্ত মৌসুম এলেই বাগানকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে এলাকায় নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রাখাব উদ্দিন বলেন, এটি তার বাবার হাতে গড়া স্বপ্নের বাগান। নিজেদের উদ্যোগে কিছু উন্নয়ন করা হলেও সরকারি সহায়তা পেলে আরও আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।