যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মার-এ-লাগো বাসভবনে নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টাকালে এক অস্ত্রধারী যুবক নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে, রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ওই ব্যক্তি অবৈধভাবে সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালাতে বাধ্য হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মার-এ-লাগোর সুরক্ষিত সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ার পর ওই ব্যক্তিকে থামানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা গুলি চালান। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হননি।
ঘটনার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প মার-এ-লাগো বাসভবনে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তখন ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করছিলেন বলে নিশ্চিত করেছে সিক্রেট সার্ভিস। ফলে এই ঘটনায় ট্রাম্প বা তার পরিবারের কোনো সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হননি।
নিহত ব্যক্তির নাম অস্টিন টি মার্টিন বলে জানিয়েছে বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজ। তিনি উত্তর ক্যারোলিনার ক্যামেরন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্টিনের কাছ থেকে একটি শটগান উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া তার হাতে একটি জ্বালানির পাত্রও ছিল।
সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, মার-এ-লাগোর উত্তর দিকের ফটকের কাছে ওই যুবককে অস্ত্র ও জ্বালানির পাত্রসহ দেখা যায়। নিরাপত্তা বাহিনী তাকে থামতে বলে এবং তার হাতে থাকা জিনিসপত্র ফেলে দিতে নির্দেশ দেয়। পাম বিচ কাউন্টি শেরিফ রিক ব্র্যাডশ বলেন, “আমরা তাকে শুধু বলেছিলাম—জিনিসপত্র ফেলে দাও।”
ব্র্যাডশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে মার্টিন জ্বালানির পাত্রটি নিচে নামিয়ে রাখেন। এরপর তিনি শটগানটি গুলি করার ভঙ্গিতে সামনে তাক করেন। ওই মুহূর্তেই সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে বাধ্য হন। তবে তার বন্দুকে গুলি ভরা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
ঘটনার সময় সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যদের শরীরে ‘বডি ক্যাম’ লাগানো ছিল। ফলে পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে রেকর্ড হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। এসব ফুটেজ এখন তদন্তের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার আগে উত্তর ক্যারোলিনায় বসবাসকারী মার্টিনের পরিবারের সদস্যরা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে খুঁজে না পেয়ে স্থানীয় পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এরপরই ফ্লোরিডায় তার উপস্থিতির বিষয়টি সামনে আসে।
এই ঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। সংস্থাটির মুখপাত্র ব্রেট স্কিলস জানিয়েছেন, যেখানে গুলির ঘটনা ঘটেছে সেটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার আওতাধীন একটি সুরক্ষিত এলাকা। এফবিআই ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং নিহত মার্টিনের ব্যক্তিগত তথ্য তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, মার্টিনের বিরুদ্ধে অতীতে এ ধরনের কোনো অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফ্লোরিডায় এর আগে ট্রাম্পের ওপর হওয়া বন্দুক হামলার সঙ্গেও তার কোনো যোগসূত্র মেলেনি। তিনি যে শটগানটি নিয়ে বাসভবনে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন, সেটি উত্তর ক্যারোলিনা থেকে ফ্লোরিডায় যাওয়ার পথে কেনা হয়েছিল কি না—তাও খতিয়ে দেখছে এফবিআই।
গুলির ঘটনার পর রোববার মার-এ-লাগো পরিদর্শন করেন সিক্রেট সার্ভিসের পরিচালক শন কারান। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানান, এজেন্টদের আরও সতর্ক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মার-এ-লাগো বাসভবনটি অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি এলাকায় অবস্থিত। এখানে দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। বাইরের অংশে দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা এবং ভেতরের অংশে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা। প্রতিটি দর্শনার্থীর দেহ তল্লাশি করা হয় এবং গাড়ি ও ব্যাগ পরীক্ষা করা হয় প্রশিক্ষিত কুকুর ও মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে।
নিরাপত্তা এত কঠোর হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অতীতে ট্রাম্পের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ায় এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি হত্যাচেষ্টার শিকার হন। সেবার গুলি তার কান ছুঁয়ে চলে যায় এবং অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। ওই ঘটনায় একজন নিহত ও আরও দুজন আহত হন।
সব মিলিয়ে, মার-এ-লাগোতে সাম্প্রতিক এই ঘটনা ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্ত শেষে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।