থাইল্যান্ডজুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই নজর কেড়েছে বিরোধী দল পিপলস পার্টির কমলা রঙের প্রচার বাস। ‘ভবিষ্যৎকে বেছে নিন’ স্লোগানে পরিচালিত এই প্রচারে অংশ নিচ্ছেন দলটির সংস্কারপন্থী নেতারা। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি শুনতে ভিড় জমাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে লাখো দর্শকের কাছে।
আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের আগে এই জনসমর্থন অনেক ভোটারের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তাঁদের বিশ্বাস, পিপলস পার্টির প্রস্তাবিত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ হয়তো এবার বাস্তব রূপ নিতে পারে। তবে থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনে জয় মানেই যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা পাওয়া—তা নয়।
নিজস্ব কমলা রঙের কারণে ‘কমলা দল’ নামে পরিচিত পিপলস পার্টি আসলে একটি দীর্ঘদিনের প্রগতিশীল আন্দোলনের সর্বশেষ রূপ। রাজতন্ত্রপন্থী রক্ষণশীল শক্তিগুলোর সঙ্গে এই আন্দোলনের সংঘাত নতুন নয়। দলটির পূর্বসূরি ২০২৩ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৫০০ আসনের মধ্যে ১৫১টিতে জয়ী হলেও সামরিক বাহিনী-নিয়ন্ত্রিত সিনেট তাদের সরকার গঠনে বাধা দেয়। পরবর্তীতে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত করার আহ্বানের অভিযোগে সাংবিধানিক আদালত দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
‘ব্রেকিং দ্য সাইকেল’ প্রামাণ্যচিত্রের সহপরিচালক থানক্রিত দুয়াংমানিপর্ন বলেন, বিরোধী শিবিরে জনসমর্থন বাড়লেও রক্ষণশীল গোষ্ঠীর হাতে থাকা ক্ষমতার কাঠামো এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর মতে, বিপুল ভোট পেলে হয়তো শেষ পর্যন্ত ওই শক্তিকে সমঝোতায় আনতে বাধ্য করা যেতে পারে। তবে আপাতত বিরোধীদের লড়াই সীমাবদ্ধ ব্যালট বাক্সেই।
প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশ থাইল্যান্ড গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে এক ধরনের রাজনৈতিক চক্রে আবদ্ধ। ইতিহাস বলছে, সংস্কারপন্থী দলগুলো প্রায়ই নির্বাচনে জয়ী হলেও আদালতের রায়, অভ্যুত্থান কিংবা রাজতন্ত্রঘনিষ্ঠ বিচারক, জেনারেল ও ধনকুবেরদের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারায়।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলছে, এবারও সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে পিপলস পার্টি। তবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল ভুমজাইথাই পার্টি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ৩০ জানুয়ারির জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী পদে পছন্দের তালিকায় পিপলস পার্টির নেতা নাথাফং রুয়েংপানিয়াউত ২৯ দশমিক ১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শীর্ষে, আর অনুতিন রয়েছেন ২২ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে। দলীয় সমর্থনে পিপলস পার্টি এগিয়ে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশে, ভুমজাইথাইয়ের অবস্থান ২২ দশমিক ৬ শতাংশ।
থাইল্যান্ডে প্রধানমন্ত্রী হতে হলে অন্তত ২৫১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, পিপলস পার্টি যদি এককভাবে এ সংখ্যা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রক্ষণশীল শক্তি, ফিউ থাই ও ছোট দলগুলোর সমর্থনে অনুতিনই পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারেন।
পিপলস পার্টির শিকড় ২০১৮ সালে গঠিত ফিউচার ফরোয়ার্ড পার্টিতে। অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা দলটি ২০১৯ সালের নির্বাচনে ৮১টি আসন পায়। তবে এক বছরের মধ্যেই আদালতের আদেশে দলটি বিলুপ্ত হয়। পরবর্তীতে মুভ ফরোয়ার্ড নামে পুনর্গঠিত হয়ে তারা ২০২৩ সালে আবার জয় পেলেও পুনরায় নিষিদ্ধ হয়।
২০২৪ সালে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করা পিপলস পার্টির ৩২ বছর বয়সী আইনপ্রণেতা রুকচানোক শ্রিনর্ক বলেন, অতীতের এসব ধাক্কা সত্ত্বেও দলটি থাই রাজনীতিকে বদলে দিয়েছে। ‘আইস’ নামে পরিচিত এই নেতা দাবি করেন, তাঁর দল ভোট কেনা ছাড়াই নির্বাচনে জয়ী হয়েছে—যা গ্রামীণ রাজনীতির প্রচলিত সংস্কৃতির বিপরীত।
তবে থম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিশেষজ্ঞ প্রিনিয়া থায়ওয়ানারুমিতকুল সতর্ক করে বলেন, গ্রামাঞ্চলে এখনো ‘টাকার রাজনীতি’ প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, পিপলস পার্টির সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে তখনই, যখন তারা অন্তত ২০০টির বেশি আসন নিশ্চিত করতে পারবে।
এদিকে রক্ষণশীল শিবিরও চুপ করে নেই। সীমান্ত সংকট, দেশপ্রেম এবং সামরিক বাহিনীর সমর্থনকে সামনে রেখে অনুতিন চার্নভিরাকুল নিজেকে শক্ত বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন। ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক অভিজাতদের সমর্থন এবং কিছু জনবান্ধব নীতির কারণে তাঁর দল ভুমজাইথাই ধীরে ধীরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে।
সব মিলিয়ে আজকের নির্বাচন থাইল্যান্ডের জন্য শুধু আরেকটি ভোট নয়—এটি নির্ধারণ করবে, দেশটি কি অবশেষে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চক্র ভাঙতে পারবে, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই আবারও ঘটবে।
কসমিক ডেস্ক