জ্ঞান ও ক্ষমতার বিপরীত মুখ: ইয়েং থিরিথের জীবন The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

জ্ঞান ও ক্ষমতার বিপরীত মুখ: ইয়েং থিরিথের জীবন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 7, 2026 ইং
জ্ঞান ও ক্ষমতার বিপরীত মুখ: ইয়েং থিরিথের জীবন ছবির ক্যাপশন:

ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে শেক্‌সপিয়ার গবেষকদের একটি আলাদা মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু ইয়েং থিরিথ সেই পরিচয়ে ইতিহাসে স্থান পাননি। শেক্‌সপিয়ারের সাহিত্য বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করা এই নারীকে বিশ্ব মনে রেখেছে এক ভয়াবহ গণহত্যার দোসর হিসেবে।

সত্তরের দশকে ডেমোক্রেটিক কাম্পুচিয়া—বর্তমান কম্বোডিয়ায়—খেমাররুজ পার্টির শাসনামলে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা। এই শাসনের মূল নেতা ছিলেন কুখ্যাত পল পট। তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ইয়েং সারি, আর সারির স্ত্রীই ছিলেন ইয়েং থিরিথ। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন পল পটের প্রথম স্ত্রী খিউ পোনারির ছোট বোন—অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠীর একেবারে অভ্যন্তরীণ বৃত্তের সদস্য।

এই কারণেই থিরিথকে খেমাররুজ শাসনের ‘ফার্স্ট লেডি’ বলা হতো। তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন না, কিন্তু বাস্তবে ছিলেন শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ক্ষমতা ছিল ব্যাপক।

পল পটের শাসনামলে কম্বোডিয়ায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ অনাহারে, চিকিৎসার অভাবে, অতিরিক্ত পরিশ্রমে কিংবা সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে মারা যায়। এই গণহত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যাঁরা নীতিগত ভূমিকা রেখেছিলেন, ইয়েং থিরিথ তাঁদের অন্যতম।

১৯৩২ সালের ১০ মার্চ কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম হয় ইয়েং থিরিথের। তাঁর বাবা ছিলেন একজন প্রভাবশালী বিচারক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারিবারিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব কেটেছে। থিরিথ নমপেনের লাইসি সিসোয়াথ থেকে স্নাতক শেষ করেন। পরে বড় বোন খিউ পোনারির সঙ্গে ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন। শেক্‌সপিয়ারের সাহিত্য বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা থিরিথ ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যে ডিগ্রি পাওয়া কম্বোডিয়ার প্রথম নাগরিক।

প্যারিসের গ্ল্যামারাস জীবন ছেড়ে তিনি দেশে ফেরেন ১৯৫৭ সালে। শুরুতে ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতা করলেও খুব দ্রুত স্বামী ইয়েং সারির সঙ্গে বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। খেমাররুজ পার্টি ক্ষমতায় এলে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের একজন।

ইয়েং থিরিথকে শুধু একজন নেতার স্ত্রী হিসেবে দেখলে ইতিহাসের বড় ভুল হবে। তিনি ছিলেন শাসনব্যবস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক মুখ। সমাজকল্যাণমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অধীনে ছিল স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাত। এই ক্ষমতা ব্যবহার করেই তিনি সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে হাজারো মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়।

তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে পুনঃশিক্ষা শিবিরে পাঠানোর নির্দেশ দিতেন। এসব শিবির থেকে অধিকাংশ মানুষ আর ফেরেনি। খেমাররুজদের কুখ্যাত জোরপূর্বক গণবিয়ে ব্যবস্থার সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করতেন।

খেমাররুজ শাসনের পতনের পর ইয়েং থিরিথ দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। অবশেষে ২০০৭ সালে তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

২০১১ সালে বিচার শুরু হলে চিকিৎসকেরা জানান, থিরিথ আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত। আদালতেও তাঁর আচরণ ছিল অসংলগ্ন। মানসিক অসুস্থতার কারণে ২০১২ সালে তাঁকে বিচারের অযোগ্য ঘোষণা করে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে তাঁর স্বামী ইয়েং সারি মারা যান। দুই বছর পর ২০১৫ সালে মৃত্যু হয় ইয়েং থিরিথের।

একজন শেক্‌সপিয়ার বিশেষজ্ঞ হয়েও ইয়েং থিরিথ ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন মানবতার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে। জ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি যে নৃশংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা নয়—ইয়েং থিরিথের জীবন সেই নির্মম সত্যেরই প্রতীক।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
জামায়াতকে পাশে রেখে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতায় এনসিপি

জামায়াতকে পাশে রেখে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতায় এনসিপি