নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে ছয় বছর আগে দায়ের হওয়া মামলায় অবশেষে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোর বিচার শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী কারাকাসে চালানো এক অভিযানের পর তাঁকে সেফ হোম থেকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়। প্রথম শুনানিতে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হলেও, মামলাটির নিষ্পত্তি দ্রুত হচ্ছে না বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
অভিযোগ ও আইনি জটিলতা
মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক–সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির পরিকল্পনা, অবৈধ অস্ত্র ও ধ্বংসাত্মক সরঞ্জাম রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমাণ করা রাষ্ট্রপক্ষের জন্য সহজ নয়। একজন সাবেক বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা কেবল আইনি নয়, কূটনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল।
শুনানির প্রথম দিনেই মাদুরো নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করেন। তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও মাদক ও অস্ত্র মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতে মাদুরোর বক্তব্য ছিল, তাঁকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘অপহরণ’ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছে।
বিচার ভেস্তে দেওয়ার সম্ভাব্য কৌশল
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদুরোর আইনজীবীরা বিচার শুরুর আগেই একাধিক আইনি মারপ্যাঁচ ব্যবহার করতে পারেন। মায়ামিভিত্তিক সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর ডিক গ্রেগরি বলেন, মাদুরো সহজে সমঝোতায় যাবেন—এমন সম্ভাবনা কম। বরং তিনি আইনের প্রতিটি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিচার দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করবেন।
একটি কৌশল হতে পারে—আটকের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী দাবি করতে পারেন, তাঁদের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁরা প্রসিকিউশনের কাছে মামলার সব প্রমাণ ও নথি দেখতে চাইতে পারেন, যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যও থাকতে পারে।
গোপন নথির ‘ফাঁদ’
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বহু তথ্য আদালতে সরাসরি প্রকাশ করা যায় না। এসব তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিচারকের অধীনে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া চলে। আইনজীবীরা কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন স্পর্শকাতর নথি দাবি করেন, যা প্রকাশ পেলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হতে পারে। সরকার যদি মনে করে, মামলা চালাতে গেলে গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাহলে তারা মামলাটি প্রত্যাহারও করতে পারে—অতীতে এমন নজির রয়েছে।
রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তির যুক্তি
মাদুরো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলতে পারেন—রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়মুক্তি। তিনি আদালতে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি এখনো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। তাঁর স্ত্রীও নিজেকে ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
তবে এই যুক্তি সহজে গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০২৪ সাল থেকেই মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়মুক্তি পেতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে স্বীকৃতি দিতে হয়, যা মাদুরোর ক্ষেত্রে নেই। তবু বিষয়টি আপিল হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাক্ষ্য ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
মাদুরো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে অনেকেই সাহস পেতে পারেন। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সাক্ষীদের নিরাপত্তা। মাদক পাচারের মামলায় সাক্ষীরা প্রায়ই হুমকির মুখে পড়েন। অতীতে বহু মামলায় সাক্ষীরা শেষ মুহূর্তে ভয়ে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
আইন সংস্থা মেয়ার ব্রাউনের অংশীদার জিনা পারলোভেচিও বলেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে মামলা তৈরিতে সম্ভবত তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনই রাজসাক্ষী হয়েছেন। এর আগে তাঁর স্ত্রীর দুই ভাতিজাকেও যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের মাদক মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছিল।
প্রমাণের ভার
সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর মাইকেল নাডলার বলেন, মাদক পাচারের মামলায় শুধু ব্যাংক লেনদেন দেখালেই হয় না। এমন কাউকে দরকার, যিনি সরাসরি বলতে পারবেন—মাদুরো জানতেন এবং জড়িত ছিলেন।
অভিযোগপত্রে ২০১৩ সালে প্যারিসে এক টন কোকেন পাঠানোর একটি ঘটনার উল্লেখ আছে, যেখানে বলা হয়েছে—মাদুরো অতিরিক্ত মাদক পাঠানো নিয়ে পাচারকারীদের তিরস্কার করেছিলেন। এ ধরনের নির্দিষ্ট তথ্য ইঙ্গিত দেয়, প্রসিকিউটরদের হাতে মাদুরোর খুব কাছের কোনো ব্যক্তির সাক্ষ্য থাকতে পারে।
সমঝোতার প্রশ্ন
বেশির ভাগ ফেডারেল মামলায় আসামিরা সাজা কমাতে সমঝোতায় যান। মাদুরোর ক্ষেত্রেও তাত্ত্বিকভাবে সেই সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে বা মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলে।
তবে ডিক গ্রেগরির মতে, মাদুরোর মতো প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সহজে আপস করে না। তাঁকে আটক করতে বিপুল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে। তাই প্রসিকিউটরদের লক্ষ্য হবে—পূর্ণাঙ্গ বিচার সম্পন্ন করা।
আইন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মাদুরোর সামনে দীর্ঘ ও কঠিন আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে, যার পরিণতি নির্ধারণে সময় লাগতে পারে বহু বছর।