রমজান মাসে তারাবির নামাজে কুরআনুল কারিম খতম করা মুসলিম সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রমজানের ২০তম তারাবিতে সাধারণত কুরআনের ২৩তম পারা তিলাওয়াত করা হয়। এই পারায় সূরা ইয়াসিনের শেষাংশ, সূরা সাফফাত, সূরা সাদ এবং সূরা জুমারের প্রথমাংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই সূরাগুলোতে আল্লাহর একত্ববাদ, আখিরাতের বাস্তবতা, নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা এবং মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ তুলে ধরা হয়েছে।
সূরা ইয়াসিন (২২–৮৩)
এই পারার শুরুতে উল্লেখ রয়েছে হাবিব নাজ্জার নামে এক ব্যক্তির ঘটনা। তিনি ছিলেন নিজের জাতির কল্যাণকামী একজন মানুষ। তিনি তার জাতিকে সত্যের পথে আহ্বান করেছিলেন এবং নবীদের অনুসরণ করার উপদেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু তার জাতি তার উপদেশ গ্রহণ করেনি। বরং তারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে তাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরাটিতে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব, একত্ববাদ এবং তাঁর অসীম কুদরতের বিভিন্ন নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার প্রসঙ্গও বর্ণিত হয়েছে।
সূরা ইয়াসিনের আলোচনার বড় একটি অংশ মৃত্যুর পরের জীবন এবং মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে। সূরার শেষাংশেও আখিরাতের বিষয়েই আলোচনা করা হয়েছে।
সূরা সাফফাত
মক্কায় অবতীর্ণ এই সূরার শুরুতে ফেরেশতাদের আলোচনা রয়েছে। যারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর তাসবিহে রত থাকেন।
এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, জিনরা যখন আকাশের সংবাদ গোপনে শোনার চেষ্টা করে, তখন জ্বলন্ত অঙ্গার তাদের ধাওয়া করে।
সূরাটিতে পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশ এবং মানুষের কর্মফলের প্রতিদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
এরপর জাহান্নামিদের পারস্পরিক দোষারোপ এবং জান্নাতিদের শান্তিপূর্ণ কথোপকথনের বর্ণনা এসেছে।
এই সূরায় হজরত নুহ, ইবরাহিম, মুসা, হারুন, ইলিয়াস, লুত এবং ইউনুস (আ.)-এর বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
সূরার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—আল্লাহর প্রেরিত বান্দারা শেষ পর্যন্ত সাহায্য লাভ করেন এবং সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
সূরা সাদ
সূরা সাদের শুরুতে আল্লাহ তায়ালা কোরআনের শপথ করেছেন। এই শপথের মাধ্যমে কোরআনের সত্যতা এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের সত্যতা তুলে ধরা হয়েছে।
এই সূরায় আল্লাহর একত্ববাদ, মুশরিকদের অহংকার এবং অবিশ্বাসীদের পরিণতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ধৈর্য ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এখানে হজরত দাউদ (আ.), সোলাইমান (আ.), আইয়ুব (আ.), ইবরাহিম (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.), ইসমাইল (আ.), ইয়াসা (আ.) এবং জুলকিফল (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া হজরত আদম (আ.) এবং অভিশপ্ত ইবলিসের ঘটনাও এখানে উল্লেখ রয়েছে।
সূরার শেষাংশে নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে ঘোষণা করতে বলা হয়েছে—তিনি এই দাওয়াতের জন্য কোনো পারিশ্রমিক চান না এবং কোরআন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ।
সূরা জুমার
সূরা জুমারের মূল আলোচ্য বিষয় হলো তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ।
এই সূরায় বলা হয়েছে, মানুষের সব ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া উচিত এবং এতে কোনো রিয়া বা লোকদেখানো থাকা উচিত নয়।
সূরাটিতে আল্লাহর একত্ববাদের বিভিন্ন নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে মানুষের সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে—আল্লাহ মানুষের সৃষ্টি করেন মায়ের গর্ভে তিন স্তরের অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে।
সূরায় একত্ববাদে বিশ্বাসী ও শিরকে লিপ্ত মানুষের দুটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
শিরকে লিপ্ত মানুষের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে এমন এক দাসের মতো, যার একাধিক মালিক রয়েছে এবং তারা সবাই ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশ দেয়।
অন্যদিকে একত্ববাদে বিশ্বাসী মানুষের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে এমন এক দাসের মতো, যার মালিক একজন—যিনি তার প্রয়োজন ও কল্যাণের প্রতি যত্নশীল।
উপসংহার
২০তম তারাবিতে তিলাওয়াতকৃত এই সূরাগুলো মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন, আখিরাতের প্রতি সচেতন হওয়া এবং নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানায়।
কোরআনের এই শিক্ষা কেবল কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা সময়ের জন্য নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন উপদেশ।
লেখক: সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ
কসমিক ডেস্ক