ভেনেজুয়েলার উত্তর-মধ্যাঞ্চলে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পে দেশটির অবকাঠামো ও জনজীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ দুর্যোগে সরাসরি ভৌত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় দেশটির সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ ও মানবিক কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো।
সোমবার (৬ জুলাই) নিউইয়র্কে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য জরুরি সহায়তা দ্রুত সম্প্রসারণে সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।
গত ২৪ জুন মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার উত্তর-মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানে। এতে বহু ভবন ধসে পড়ে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।
জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কার্যালয় (UNDRR)-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনায়। অন্যদিকে ১৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে অবকাঠামো খাতে।
অবকাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, যেখানে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ও সড়ক নেটওয়ার্কেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তবে জাতিসংঘ স্পষ্ট করেছে, এই হিসাব মাঠপর্যায়ের সরাসরি জরিপ নয়; বরং ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষতি, ব্যবসা বন্ধ থাকা, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, পুনর্গঠন ব্যয় কিংবা জরুরি সেবার অতিরিক্ত খরচ অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে।
এদিকে, ইউনিসেফ জানিয়েছে, দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশুরা। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যার মধ্যে ২ লাখ ৩৪ হাজার শিশু রয়েছে।
রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউনিসেফ ইতোমধ্যে জরুরি সাড়া প্রদানকারী দল মোতায়েন করেছে এবং ৬৮ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ পানি সরবরাহের উপকরণ, স্যানিটেশন সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী।
এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, নিরাপদ পানি, শিশুসুরক্ষা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইউনিসেফ ৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (OCHA) জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এখনো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ দল দুর্গত এলাকায় কাজ করছে এবং মানবিক চাহিদা নিরূপণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর ভিত্তিতে নতুন ত্রাণ পরিকল্পনা ও অতিরিক্ত অর্থায়নের আবেদন প্রস্তুত করা হবে।
ভেনেজুয়েলা সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ৩ হাজার ৩৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত, ১৬ হাজার ৭৪০ জনেরও বেশি আহত এবং প্রায় ১৭ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক