বাংলাদেশ ডাকের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল রূপান্তর ও আর্থিক সেবা শক্তিশালী করতে ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। নতুন এই অধ্যাদেশে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, তথ্য সুরক্ষা ও ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট একাধিক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ‘The Post Office Act, 1898’ বাতিল করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সময়োপযোগী আইন কাঠামো প্রবর্তন করা হচ্ছে। নতুন আইনে ডাক ও কুরিয়ার খাতে আধুনিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, ডিজিটাল সেবা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ডাক ও কুরিয়ার সেবার জন্য একটি আইনিভাবে ক্ষমতায়িত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে, যা সকল বাণিজ্যিক ডাক ও কুরিয়ার অপারেটরের লাইসেন্স প্রদান, সেবার মান নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। একই সঙ্গে খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে সার্বজনীন ডাকসেবার জন্য প্রাপ্ত সরকারি সংস্থান অন্য প্রতিযোগিতামূলক খাতে ব্যবহার না হয়।
লাইসেন্সবিহীনভাবে ডাক, কুরিয়ার বা পার্সেল ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। নতুন আইনে এই জরিমানা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি।
ডাক বিভাগ ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের (ইউপিইউ) ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত ডেজিগনেটেড অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। কুরিয়ার ও ই-কমার্স লাইসেন্স প্রদানের জন্য গঠন করা হবে ‘মেইলিং কুরিয়ার লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ’। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি পোস্টাল কাউন্সিল গঠনের কথাও অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে।
নতুন আইনে প্রচলিত ডাকটিকিটের পাশাপাশি ডিজিটাল ডাকটিকিট বা ই-স্ট্যাম্পিং চালুর বিধান রাখা হয়েছে। গ্রাহক অনলাইনে বিল পরিশোধের মাধ্যমে সুরক্ষিত কিউআর কোড বা বারকোড পাবেন, যা বৈধ ডাকটিকিটের সমতুল্য আইনি স্বীকৃতি পাবে।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর বিধান অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অপারেটরদের গ্রাহকের তথ্য শুধুমাত্র সেবা প্রদানের প্রয়োজনে ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় তথ্য মুছে ফেলা এবং সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ডাক ও কুরিয়ার খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে একটি সেন্ট্রাল লজিস্টিক্স ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা ও সকল অপারেটরের আন্তঃপরিচালন নিশ্চিত করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ই-কমার্সসহ বিভিন্ন সেবার ট্র্যাকিং তথ্য সহজে পাওয়া যাবে।
ডেজিগনেটেড অপারেটর কর্তৃক পরিচালিত ডাকসেবাকে জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় জরুরি সেবা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় সংকটকালে ডাক, যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট জনবল অগ্রাধিকারভিত্তিতে চলাচলের সুবিধা পাবে।
অধ্যাদেশে বাংলাদেশ ডাকের নেটওয়ার্ককে দেশের জাতীয় সংযোগ, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোকে দাপ্তরিক চিঠি, ডকুমেন্ট ও সংবেদনশীল পার্সেল প্রেরণে ডাকসেবা ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ডাক বিভাগের অধীনে চিফ কন্ট্রোলার অব স্ট্যাম্পস দপ্তর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সকল পোস্টাল ও নন-পোস্টাল স্ট্যাম্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সীমান্ত অতিক্রমকারী সকল ডাক ও পার্সেলের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক অগ্রিম ডাটা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারে কেওয়াইসি যাচাইকরণ, এক্স-রে স্ক্যানিং, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্টিনজেন্সি পরিকল্পনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশে বাংলাদেশ ডাকের আর্থিক সেবাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডাক জীবন বিমা ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংককে ‘অধিকারী ডাকসেবা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এসব সেবায় সরকারি গ্যারান্টি আরও সুদৃঢ় হবে। একই সঙ্গে সব আর্থিক সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক