বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আবারও অধরাই থেকে গেল ব্রাজিলের। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্টের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচ শেষে সবচেয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়রের আবেগঘন মন্তব্য, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন নেইমার। তবে সেই গোলও দলের পরাজয় এড়াতে পারেনি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ব্রাজিলের গণমাধ্যম গ্লোভো টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের ইতি ঘটেছে। এখন সব শেষ। আমি চেষ্টা করেছি, সত্যিই চেষ্টা করেছি। এখানেই আমার শুরু হয়েছিল, এখানেই শেষ হলো।’ তার এই বক্তব্যের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
নেইমারের এই মন্তব্যকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে একটি বিশেষ স্মৃতি। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ঠিক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল তার। দীর্ঘ ১৬ বছর পর একই স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে বিদায়ের ইঙ্গিত দেওয়ায় ঘটনাটি ফুটবলপ্রেমীদের আবেগাপ্লুত করেছে।
যদি এই ম্যাচটিই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে, তবে তিনি ব্রাজিলের হয়ে এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি টানবেন। ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি করেছেন ৮০টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫৮টি গোল। গোলসংখ্যার বিচারে তিনি ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে নেইমারের ক্যারিয়ার ছিল আলোচিত হলেও শিরোপাহীন। চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও তিনি ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি। এর ফলে তিনি ব্রাজিলের ইতিহাসে দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপাবঞ্চিত থাকার তালিকায় নাম লেখালেন। এর আগে একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল সাবেক অধিনায়ক থিয়াগো সিলভার।
তবে বিশ্বকাপ শিরোপা না জিতলেও ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের অবদান অনস্বীকার্য। ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ জয়ে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান নায়ক। এছাড়া ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণপদক এনে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই স্বর্ণপদকই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার অন্যতম বড় অর্জন।
দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নেইমার অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। অসাধারণ ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা, গোল করার দক্ষতা এবং ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার সামর্থ্যের কারণে তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অনেক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের জন্যও তিনি অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।
তবে ইনজুরি, ধারাবাহিক সমালোচনা এবং বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার আক্ষেপ তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বারবার ফিরে এসেছে। এবার শেষ ষোলো থেকেই বিদায়ের পর দেওয়া বক্তব্যে সেই হতাশারই প্রতিফলন দেখা গেছে। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি, তবুও তার মন্তব্য ফুটবলবিশ্বে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
এখন ব্রাজিল ফুটবল সমর্থকদের অপেক্ষা নেইমারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য। তিনি সত্যিই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন, নাকি আবারও সেলেসাওদের জার্সিতে মাঠে ফিরবেন—সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
কসমিক ডেস্ক