সন্তান মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পাওয়া এক অমূল্য নেয়ামত। যাঁদের সন্তান নেই, তাঁরাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন সন্তানহীনতার বেদনা কতটা গভীর। ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করেছে, তেমনি সন্তানের প্রতিও পিতা-মাতার ওপর অর্পণ করেছে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সু-সন্তান শুধু পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তির কারণ নয়; বরং পরকালের মুক্তিরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে সন্তানকে আল্লাহ তায়ালা জীবনের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, “সম্পদ ও সন্তান পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।” (সুরা কাহাফ: ৪৬)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়—সন্তান কেবল পারিবারিক বন্ধনের অংশ নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ অনুগ্রহ।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক পিতা-মাতা এই শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের যথাযথ কদর করেন না। সময়মতো সন্তানকে ইসলামী নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা না দিয়ে অবহেলা করলে সেই সন্তান ধীরে ধীরে আদর্শহীন হয়ে পড়ে। নৈতিক শিক্ষাবঞ্চিত সন্তান পরিণত বয়সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যার প্রভাব পড়ে তার ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক শান্তিতে। শেষ পর্যন্ত এসব অবহেলার প্রায়শ্চিত্ত বহন করতে হয় পিতা-মাতাকেই। এ জন্য ইতিহাসের পাতা খোলার প্রয়োজন নেই—আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্রই এর সাক্ষ্য দেয়।
ইসলাম পিতা-মাতাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করার পর তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তানের দোয়া। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সু-সন্তান পিতা-মাতার জন্য মৃত্যুর পরও কল্যাণের উৎস।
ইসলাম সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। প্রথমত, প্রতিটি সন্তান মাতৃগর্ভে সুরক্ষিত থাকার অধিকার রাখে। গর্ভাবস্থায় সন্তানের জীবন রক্ষা করা পিতা-মাতার অপরিহার্য দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন—দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, সন্তান জন্মের পর তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়া। এর মাধ্যমে শিশুর কানে সর্বপ্রথম তাওহীদের বাণী পৌঁছে দেওয়া হয়, যা তার ঈমানি জীবনের সূচনা করে।
তৃতীয়ত, সন্তানের জন্য সুন্দর ও অর্থবহ নাম নির্বাচন করা। নাম শুধু পরিচয়ের মাধ্যম নয়; এটি সন্তানের ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। তাই ইসলামিক অর্থবোধক ভালো নাম রাখা পিতা-মাতার দায়িত্ব।
চতুর্থত, সন্তানকে দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেওয়া। ইসলামের মৌলিক জ্ঞান, নৈতিকতা ও আদর্শ শেখানো ছাড়া সন্তান দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে পারে না। হাদিসে জ্ঞান অর্জনকে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ বলা হয়েছে, যা সন্তানের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
পঞ্চমত, সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা। দোয়া ইবাদতের মূলভিত্তি। পিতা-মাতার দোয়া সন্তানের জন্য এক অমূল্য ঢাল, যা বহু বিপদ ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করতে পারে।
একজন আলেমের উক্তি এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য—“সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার চেয়ে সন্তানদেরই সম্পদ বানিয়ে যাওয়া উত্তম।” প্রকৃতপক্ষে সন্তানই হলো পিতা-মাতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
পরিশেষে বলা যায়, পিতা-মাতাই সন্তানের মানুষ হওয়ার কারিগর। সন্তানের চরিত্র গঠন, নৈতিক শিক্ষা প্রদান এবং তার ভবিষ্যৎ কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করা—এটাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সন্তানদের সু-সন্তান হিসেবে গড়ে তোলার এবং সন্তানের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।