ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, দেশের অর্থনীতি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয় নিজেরাই বহন করতে সক্ষম। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলের জিডিপি প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে এবং আগামী বছর থেকেই আর্থিক চাহিদার বড় অংশ নিজস্ব সম্পদ থেকেই মেটানো সম্ভব হবে।
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের দীর্ঘদিনের আর্থিক ও কৌশলগত নির্ভরতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইসরায়েলকে সামরিক, কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে নেতানিয়াহু মনে করেন, ইসরায়েল এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ধাপে ধাপে এই সহায়তার প্রয়োজন কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা একবারে বন্ধ করার পরিকল্পনা নয়, বরং ধীরে ধীরে কমিয়ে ১০ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন বলে দাবি করেন। নেতানিয়াহুর মতে, ইসরায়েলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতি দেশটিকে আরও স্বনির্ভর করে তুলছে।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি হয়, যার আওতায় ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। এই চুক্তি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের অন্যতম বড় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য ভবিষ্যতে এই সহায়তা কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরায়েলের অর্থনীতি নিয়ে নেতানিয়াহুর আশাবাদী বক্তব্যের পেছনে দেশটির প্রযুক্তি খাত, প্রতিরক্ষা শিল্প, রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের প্রসারকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ইসরায়েল আগামী বছর থেকেই নিজস্ব বাজেট দিয়ে অধিকাংশ প্রয়োজন মেটাতে পারবে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, যুদ্ধ, নিরাপত্তা ব্যয় এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পুরোপুরি ছাড়াই চলা সহজ হবে না।
এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য তৈরি করেছে। ইসরায়েলের অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন তাদের স্বার্থকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ইরানের প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বক্তব্য শুধু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ঘোষণা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। একদিকে তিনি ইসরায়েলের সক্ষমতা তুলে ধরছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এতে অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় গর্বের বার্তা যেমন দেওয়া হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েলের অবস্থান আরও দৃঢ় করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তবে বাস্তবে এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত নিরাপত্তা, অস্ত্র সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সমর্থনের সঙ্গেও জড়িত। ফলে ১০ বছরের মধ্যে এই নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ করা ইসরায়েলের জন্য সহজ হবে না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার দাবি, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ এবং ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কসমিক ডেস্ক