বর্তমান বিশ্ব এক গভীর ও জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, কোনোভাবেই একক কোনো আদর্শ, দর্শন বা চিন্তার আধিপত্য মানব সভ্যতার জন্য স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। বরং জগতের সব ধরনের বৈচিত্র্য, ভিন্নমত ও আদর্শের অবাধ আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। আর এ জন্য প্রয়োজন মুক্ত ও দায়িত্বশীল বুদ্ধিচর্চা।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি অভিজাত হোটেলে বৈশ্বিক গবেষণা, সংলাপ ও জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বখ্যাত তুর্কি লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই। স্বাগত বক্তব্য দেন আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও জার্নালের সম্পাদক ইন চিফ মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
মন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যখন বিভ্রান্তি, বিভাজন ও ভাসাভাসা আলোচনা দ্রুত বাড়ছে, তখন জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বাসযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। তাঁর মতে, আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, গবেষণামূলক অবদান এবং বিশ্বমানের চিন্তাচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের পথ খুলে দেবে।
জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, ভাষা, জাতিসত্তা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা গোষ্ঠী এককভাবে বিশ্বকে শাসন বা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। সব মতাদর্শের স্কলার বা গবেষকদের এমন এক সাধারণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা সভ্যতার কল্যাণ বয়ে আনবে। অতীতের কোনো একক বীর কিংবা সমাজ একা বিশ্ব সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার সব ধরনের বৈচিত্র্য এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। তাঁর ভাষায়, যে যার অবস্থান থেকে নিজের কথা বলবেন এবং সুস্থভাবে সেই মতাদর্শের আদান-প্রদান হবে—এটাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আল-উম্মাহ জার্নালের ঘোষিত উদ্দেশ্যও রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও তুর্কি—এই চারটি ভাষায় জার্নালটি প্রকাশের উদ্যোগকে তিনি বিশেষভাবে সাধুবাদ জানান। তাঁর মতে, পারস্পরিক সংস্কৃতির গভীর বোঝাপড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সাহায্য করে। বহুভাষিক প্রকাশনা শুধু পাঠকসংখ্যা বাড়ায় না, বরং বিভিন্ন সভ্যতা, চিন্তাধারা ও ঐতিহ্যের মধ্যে সেতুবন্ধনও তৈরি করে।
অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই বলেন, মুসলিম বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে। সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সেই জ্ঞানচর্চার সংযোগ ঘটানো এখন সময়ের দাবি। তাঁর মতে, আল-উম্মাহ বিশ্বজুড়ে চিন্তাবিদদের সংযুক্ত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হবে এবং এটি মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা মনে করেন, জ্ঞানভিত্তিক সংলাপ, দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই ভবিষ্যতের শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের মূল ভিত্তি।
সব মিলিয়ে, আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি শুধু একটি প্রকাশনার সূচনা নয়, বরং বৈচিত্র্যকে সম্মান করে সহাবস্থানের নতুন বার্তা বহন করেছে। তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে যেমন মুক্ত বুদ্ধিচর্চার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে জ্ঞান, নৈতিকতা ও সংলাপের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে। উপস্থিত বক্তা ও অতিথিদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে ভিন্নমতকে ভয় নয়, বরং গ্রহণযোগ্যতার চোখে দেখতে হবে।
কসমিক ডেস্ক