দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট ছিল আবেগ, যোগাযোগ এবং নরম কূটনীতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা কিংবা কূটনৈতিক স্থবিরতার সময়েও ক্রিকেট অনেক ক্ষেত্রে সংলাপের দরজা খোলা রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক ভারত–বাংলাদেশ উত্তেজনায় সেই ক্রিকেটই এখন রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি কৌশলে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এই নাটকীয়তার সূচনা ঘটে, যখন ভারতের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) বাংলাদেশি ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে খেলতে নিষিদ্ধ করে। খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক লেনদেনের বাইরে গিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেটের কূটনৈতিক ভূমিকা বদলে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব ক্রিকেটের আর্থিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র এখন ভারত। প্রায় ১৫০ কোটি জনসংখ্যার দেশটি বিশ্ব ক্রিকেট আয়ের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবস্থান ভারতকে ম্যাচ আয়োজন, সূচি নির্ধারণ, ভেন্যু নির্বাচন এবং রাজস্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা দিয়েছে। ফলে ক্রিকেট ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে, যা রাজনৈতিক বার্তা পাঠাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্তকে ‘বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর প্রতিবাদ হিসেবে বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার মতো বিরল পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত আবারও দেখিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট কতটা গভীরভাবে রাজনীতি ও জনমতকে প্রভাবিত করে।
ভারতের ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত দেখা গেছে। বিজেপির নেতা নবনীত রানা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘু পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের ভারতে সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর মুস্তাফিজ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন তুলে খেলাধুলার রাজনীতিকরণ এবং ব্যক্তিগত খেলোয়াড়দের শাস্তি দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করেন।
সমালোচনার সুর উঠে এসেছে ভারতের গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের কণ্ঠেও। সিনিয়র সাংবাদিক বীর সাংঘভি এক কলামে লেখেন, ক্রিকেট বোর্ড রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে একটি ক্রীড়াবিষয়কে কূটনৈতিক অস্বস্তিতে পরিণত করেছে। একইভাবে দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার মন্তব্য করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক চাপ কূটনীতিকে প্রভাবিত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের আঞ্চলিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা খেলাটির মূল চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। ক্রিকেটে সৌহার্দ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক আচরণ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে যদি এই মূল্যবোধগুলো ভেঙে পড়ে, তাহলে ক্রিকেট তার বিশেষত্ব হারাবে।
বিশেষজ্ঞরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে ক্রিকেটকে রাজনৈতিক শত্রুতা কমানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ২০০৪ সালে ভারতের পাকিস্তান সফর, যাকে বলা হয়েছিল ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’। সেই সময় রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ক্রিকেট দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সেতু তৈরি করেছিল।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ক্রিকেট সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে মসৃণ ছিল। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও দ্বিপক্ষীয় সিরিজ চলেছে, আইপিএলে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। তবে মুস্তাফিজ ইস্যুকে ঘিরে তৈরি পরিস্থিতি সেই ধারায় বড় ধরনের ছেদ টানছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তাঁদের মতে, ক্রিকেট যদি নরম শক্তির হাতিয়ার থেকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তা শুধু খেলাটির জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের সম্পর্কের জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা বহন করবে।