দেশজুড়ে চলমান এলপি গ্যাস সংকটের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের স্ট্রিট ফুড ও ছোট খাবারের দোকানগুলোতে। লাইনের গ্যাস সংযোগ না থাকায় পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল এসব ব্যবসায়ীরা এখন রান্না চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনেও প্রয়োজনমতো গ্যাস না পাওয়ায় দৈনিক উৎপাদন কমাচ্ছেন অনেক বিক্রেতা, কেউ কেউ আবার সাময়িকভাবে দোকান বন্ধ রাখছেন।
সরেজমিনে নগরীর আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, চট্টেশ্বরী রোড, জামালখান, বহদ্দারহাট ও দুই নম্বর গেট এলাকায় দেখা গেছে, আগের মতো জমজমাট নেই ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলো। কোথাও বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও অর্ধেক দোকানই খুলছে না।
জিইসি মোড়ের সানমার ওশান সিটির পাশে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত যে এলাকায় স্ট্রিট ফুডের জমজমাট আড্ডা বসত, সেখানে এখন ক্রেতার সংখ্যা অনেকটাই কম। এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বেচাকেনা করলেও গ্যাস সংকটে সেই চিত্র বদলে গেছে।
দুই বছর ধরে ওই এলাকায় ভ্যানগাড়িতে খাবারের ব্যবসা করা মোসলেম উদ্দিন বলেন, “মাসে আমাদের তিনটি সিলিন্ডার লাগে। প্রতিটি সিলিন্ডারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হলে মাস শেষে খরচ দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। কিন্তু প্রতিযোগিতার কারণে হুট করে খাবারের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে বিক্রি কমিয়ে দিয়েছি।”
একই এলাকার ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা আবরার বলেন, “আগে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যেত। এখন ২ হাজার টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দাম বাড়ানোর চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের কাছ থেকে নিয়মিত কিনতাম, তারাও দিতে পারছে না।”
তিনি জানান, দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যায়, আর না বাড়ালে লোকসান গুনতে হয়। ফলে কিছু খাবারের আইটেম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে নগরীর মাঝারি রেস্তোরাঁগুলোতেও। চকবাজারের একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক সুমন বণিক বলেন, ভাজা আইটেমের জন্য গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেশি। গ্যাসের দাম বাড়ায় খাবারের দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই, কিন্তু দাম বাড়ালেই বিক্রি কমে যাচ্ছে।
তবে বড় রেস্তোরাঁগুলো তুলনামূলকভাবে সংকটমুক্ত। হোটেল জামান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউসের মুরাদপুর শাখার স্বত্বাধিকারী গোলাম কিবরিয়া জানান, তারা লাইনের গ্যাস ব্যবহার করায় বড় ধরনের সমস্যায় পড়েননি।
ব্যবসায়ীদের মতে, মূলধন কম, বিকল্প জ্বালানির সুযোগ সীমিত এবং দাম বাড়ানোর সীমাবদ্ধতার কারণে স্ট্রিট ফুড ও ক্ষুদ্র খাবারের দোকানগুলোর পক্ষে এই সংকট সামাল দেওয়া সবচেয়ে কঠিন। আগ্রাবাদের একটি জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড কার্টের দায়িত্বে থাকা ওসমান বলেন, “স্ট্রিট ফুড নগরবাসীর সবচেয়ে সাশ্রয়ী খাবারের উৎস। এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বে।”
রেস্তোরাঁ খাত সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বড় শহরগুলোয় খাবারের দোকানগুলোর জন্য স্থায়ী জ্বালানি সমাধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে চট্টগ্রামে হাজারো স্ট্রিট ফুড ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও নগরীর খাদ্য ব্যবস্থায় বড় চাপ তৈরি করবে।
কসমিক ডেস্ক