রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদে ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদে ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 1, 2026 ইং
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদে ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে ছবির ক্যাপশন:

দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং তারল্য সংকটের প্রভাবে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে এযাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬.০৩ শতাংশে, যা ডিসেম্বরের ৬.১ শতাংশের চেয়েও কম। অথচ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একই সূচক ছিল ১০.১৩ শতাংশ। সেই তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোর পরিসংখ্যানেও ধারাবাহিক নিম্নগতি স্পষ্ট। সেপ্টেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.২৯ শতাংশ, আগস্টে ৬.৩৫ শতাংশ, জুলাইয়ে ৬.৫২ শতাংশ, জুনে ৬.৪০ শতাংশ, মে মাসে ৭.১৭ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৭.৫ শতাংশ। নভেম্বর মাসে সাময়িকভাবে তা বেড়ে ৬.৫৮ শতাংশে উঠলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের ফল ছিল না; বরং জাতীয় নির্বাচনের আগে ঋণ পুনঃতফসিলের প্রভাবেই এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জানুয়ারি–জুন ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, কঠোর মুদ্রানীতি, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের বাড়তি ঋণগ্রহণ এবং নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা—এই তিনটি কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রবৃদ্ধির ওপর।

রাজনৈতিক পালাবদলের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই ঋণ প্রবাহে দ্রুত পতন শুরু হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্যবসায়িক আস্থায় প্রভাব ফেলেছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় জয় এলেও অনেক উদ্যোক্তা এখনো নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বিনিয়োগ বাড়াতে উচ্চ সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। একই সঙ্গে বন্ধ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান সচল করে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন তিনি। তার বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের সংকোচনমূলক নীতি থেকে কিছুটা সরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যাংক খাতের বাস্তব চিত্রও জটিল। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হলেও কিছু আমানতে প্রায় একই হারে সুদ দিতে হচ্ছে। ফলে ন্যূনতম মার্জিন রেখে ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে। তার মতে, উচ্চ সুদহার বিনিয়োগে বাধা হলেও এটি একমাত্র কারণ নয়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বন্দরসহ অবকাঠামোগত সংকট বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সরকারের বাড়তি ব্যাংকঋণ গ্রহণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩ শতাংশ। ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ ৩২.৮ শতাংশ বেড়েছে। এতে তারল্য সংকটের মধ্যে বেসরকারি খাত কার্যত চাপে পড়েছে।

খেলাপি ঋণের চাপও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি দুর্বল হয়েছে এবং সংরক্ষণ বাড়াতে হচ্ছে। নতুন ঋণ অনুমোদনে তাই তারা আরও সতর্ক।

নীতিসুদ ১০ শতাংশে উন্নীত করার ফলে বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। তারল্য সংকট ও আমানত প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও সীমিত করেছে।

দুর্বল ঋণ প্রবাহের প্রভাব ইতোমধ্যে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, যা শিল্প খাতে মন্থরতার ইঙ্গিত দেয়। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ভোক্তা চাহিদা কমেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়েছে।

জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৯.৮ শতাংশ। বাস্তবে তা লক্ষ্যের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিল্প উৎপাদন আরও দুর্বল হতে পারে, বিনিয়োগ দীর্ঘ সময় স্থবির থাকতে পারে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার বিলম্বিত হতে পারে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, জনতার গণপিটুনিতে মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, জনতার গণপিটুনিতে মৃত্যু