অসহনীয় চাঁদাবাজি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যেতে বাধ্য হবেন।
সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআইয়ের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবগঠিত সরকারের নিকট প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি সালিম সোলায়মানসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে তাসকীন আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের পরও একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আগের তুলনায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি চাঁদা দিতে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরগুলোতেও এক দিনের জন্য দুর্নীতি কমেনি।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, নতুন সরকার এমন এক সময় দায়িত্ব নিয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। এসব সমস্যার পেছনে ব্যাংকিং খাতের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং অস্থিতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দায়ী করেন তিনি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এসব সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার সামান্য অংশও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ তুলে তাসকীন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদন নিয়মিতভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এখন কারখানায় চাঁদা দেওয়া কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী দুঃশাসন পার হলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সবার আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন, পুলিশ এবং রাজস্ব কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পক্ষ চাঁদাবাজিতে জড়িত। কারা চাঁদাবাজি করছে, তা চিহ্নিত করা সরকারের দায়িত্ব।
তাসকীন আহমেদ বলেন, চাঁদাবাজরা এসে বলে তারা সরকারি দলের লোক। সরকার পরিবর্তন হলেই তারা নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে। কখনো পাড়ার অনুষ্ঠান, কখনো অফিস বা রাস্তায় চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি কারখানায় প্রবেশ করতেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, জনগণ ও ব্যবসায়ী মহল চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এবং এ বিষয়ে নতুন সরকারের কাছ থেকে কড়া বার্তা প্রত্যাশা করছে।
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, তবে বেসরকারি খাতের আপত্তি সত্ত্বেও একটি অপ্রকাশিত চুক্তির (এনডিএ) মাধ্যমে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ববিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আংশিকভাবে মওকুফ করলেও প্রত্যাশিত পূর্ণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি এ চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, অপরিবর্তিত নীতি সুদের হারের কারণে ব্যবসায়ীদের ১৬–১৭ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণ নিতে হচ্ছে। খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং ঋণ শ্রেণীকরণের সীমা কমিয়ে আনার ফলে আর্থিক খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকা এবং গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবনে চারটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কার্যকর উন্নয়ন ও চাঁদাবাজি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা, সরকারি খাতে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, ইচ্ছাকৃত নন এমন ঋণখেলাপিদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সহায়তা দেওয়া এবং ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা।