ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণের পর দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত নতুন সরকার বসানো হবে—এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল আন্তর্জাতিক মহলে। তবে সেই ধারণার বিপরীতে গিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জানিয়েছে, ভেনিজুয়েলা পরিচালনার জন্য মাদুরোর ঘনিষ্ঠরাই সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বিকল্প।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএ’র একটি গোপন মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়—মাদুরো ক্ষমতা হারালে দেশটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তার ঘনিষ্ঠ ও অনুগত শীর্ষ নেতারাই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। এই তালিকায় ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ অন্যতম।
দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ওই গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিস্তারিতভাবে ব্রিফ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সীমিতসংখ্যক জ্যেষ্ঠ সদস্যের সঙ্গে শেয়ার করা হয়। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর পরিবর্তে দেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে সরাসরি নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গোয়েন্দা ব্রিফিং পান। তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ও তার জাতীয় নিরাপত্তা টিম বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যাতে ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং দেশটির জনগণের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়।”
এর আগে অভিযানের পর ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেন, ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর প্রতি দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত জনসমর্থন নেই। তিনি আরও জানান, মাদুরোকে আটকের আগে মাচাদোর সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হয়নি।
শনিবার মার-আ-লাগোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “আমি মনে করি না মাচাদোর পক্ষে ভেনিজুয়েলার নেতৃত্ব নেওয়া সহজ হবে। তার দেশের ভেতরে প্রয়োজনীয় সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা নেই।” একই বক্তব্যে তিনি জানান, মাদুরোর উত্তরসূরি হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ওপরই তার আস্থা রয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেন, দেলসি ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
পরে সোমবার দেলসি রদ্রিগেজ নিজের ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়ে একটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ভেনিজুয়েলা শান্তি, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগোতে চায়। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিই বৈশ্বিক শান্তির ভিত্তি।
এদিকে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি পরিস্থিতি ‘ঠিকঠাক’ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, তাহলে দেশটিতে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে।
🔹 অন্তত ১৮ মাস ভেনিজুয়েলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান ট্রাম্প
এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ভেনিজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ভর্তুকি দিতে পারে। তার মতে, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ১৮ মাসেরও কম সময় লাগতে পারে।
তিনি জানান, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ভেনিজুয়েলায় কোনো নির্বাচন হবে না। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা না করা পর্যন্ত দেশটির জনগণের ভোট দেওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার সঙ্গে যুদ্ধে নেই, তবে দেলসি রদ্রিগেজ যদি সহযোগিতা না করেন, তাহলে দ্বিতীয় সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে তিনি জানান, রদ্রিগেজের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে কি না—সে বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা তদারক করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, হোয়াইট হাউজের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উভয় রাজনৈতিক দল থেকেই সমালোচনা উঠলেও ট্রাম্প জানিয়েছেন, কংগ্রেস পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিল।