দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক–ইওলকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ব্যর্থ সামরিক আইন জারি, বৈধ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরে বাধা দেওয়া এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে এই সাজা দেওয়া হয়। শুক্রবার সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট রায় ঘোষণা করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হলো। রায়ে আদালত বলেন, ইউন সুক–ইওল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং আইনসম্মত গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ায় বাধা দিয়েছেন, যা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ৬৫ বছর বয়সী ইউন সরকারি নথি জালিয়াতি করেছেন এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়াই অসাংবিধানিক উপায়ে সামরিক আইন জারি করেছিলেন। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত রায় ঘোষণার সময় তাঁকে বিমর্ষ ও শারীরিকভাবে দুর্বল দেখাচ্ছিল। তবে সাজা ঘোষণার পর তিনি তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ইউন সুক–ইওলের আইনজীবী ইউ জং–হওয়া বলেন, ‘আমরা মনে করি এই রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা অবশ্যই উচ্চ আদালতে আপিল করব।’ অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা জানান, ইউনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের আরও একটি মামলায় তাঁরা মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন। ওই মামলায় অভিযোগ, সংসদ স্থগিত করে সামরিক শাসন জারি করে তিনি কার্যত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এর আগে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি ইউন সুক–ইওলকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুরুতে তিনি প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে গ্রেপ্তার এড়ানোর চেষ্টা করেন। মাসের শুরুতে একবার তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাঁর বাসভবনে অভিযান চালালেও নিরাপত্তা বাহিনীর বাধায় সেটি ব্যর্থ হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন কর্মকর্তারা।
২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ইউন সুক–ইওল দক্ষিণ কোরিয়ায় সামরিক আইন জারি করেন। কিন্তু দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে মাত্র ছয় ঘণ্টার মাথায় তিনি সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এই স্বল্পস্থায়ী সামরিক আইন এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
এর জেরে ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্ট ইউন সুক–ইওলকে অভিশংসন করে। একই সঙ্গে তাঁকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
ইউন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান নন যিনি কারাবরণ করছেন। নব্বইয়ের দশকে সাবেক জেনারেল ও প্রেসিডেন্ট চুন দু–হোয়ান বিক্ষোভ দমনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন, যদিও পরে তাঁকে ক্ষমা করা হয়।
বর্তমানে ইউন সুক–ইওল সিউল ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী আছেন। তিনি শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, বিরোধী দলগুলোর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতেই তিনি সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
রায় ঘোষণার আগে আদালত প্রাঙ্গণে ইউনের কয়েক ডজন সমর্থক জড়ো হন। তাঁরা এই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—‘ইতিহাস এর বিচার করবে’ এবং ‘ইউন এখনো প্রেসিডেন্ট’। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আদালত ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কসমিক ডেস্ক