গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ ইরান। গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে এক ব্যাপক সরকারবিরোধী গণবিস্ফোরণে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে মাশহাদ, ইসফাহান, শিরাজসহ অন্তত ১০০টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন। রাজপথগুলো পরিণত হয়েছে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষের রণক্ষেত্রে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে। শুধু তেহরানেই অন্তত ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশের শরীরে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। আহত ও নিহতের ভিড়ে রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটসহ কঠোর ব্যবস্থা নিলেও আন্দোলনের গতি থামানো যাচ্ছে না। শনিবার রাতে তেহরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কার্যত বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। গিশা জেলা, পুনাক স্কয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়। অনেক এলাকায় থালা-বাসন বাজিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানানো হয়।
রয়টার্স ও বিবিসির যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী দূর থেকে গুলিবর্ষণ করছে। আন্দোলনের ভাষাও বদলে গেছে—এখন বিক্ষোভকারীরা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগ এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসানের দাবি তুলছে।
বিক্ষোভকারীদের দমাতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ আন্দোলনকারীদের ‘মোহারেবে’ বা ‘আল্লাহর শত্রু’ আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানি আইনে এ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এ পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামানো হয়েছে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। বাহিনীটি বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তারা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের ‘অর্জন’ রক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে।
এই সংকট আন্তর্জাতিক রূপও নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানি জনগণের ‘স্বাধীনতার’ পক্ষে সংহতি জানিয়ে হস্তক্ষেপের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন। এর জবাবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি স্থাপনা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরায়েল। দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যে কোনো পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এরই মধ্যে ইরানের বাইরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম লন্ডনে ইরানের দূতাবাসের সামনে কয়েকশ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয় এবং দূতাবাস ভবন থেকে ইরানের পতাকা নামিয়ে ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন ইরানের শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যে ফের বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।