চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছে। পোষ্য কোটা পুনর্বহাল ইস্যু থেকে শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ, প্রশাসনিক দপ্তরে তালা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া ভাষার ব্যবহার—সব মিলিয়ে কয়েক মাস ধরেই অস্থির সময় পার করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেই প্রতিক্রিয়া দ্রুতই রূপ নেয় সংঘর্ষে, যেখানে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় আসে। এসব ঘটনায় তৎকালীন সমন্বয়ক ও বর্তমান রাকসু সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বের অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর শিক্ষক সংগঠনগুলোর কর্মবিরতি, অফিসার্স সমিতির শাটডাউন এবং তদন্ত কমিটি গঠন হলেও দীর্ঘ সময়েও প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় ক্যাম্পাসে অসন্তোষ আরও ঘনীভূত হয়। এর মধ্যেই আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ডিনের পদত্যাগের দাবিতে আলটিমেটাম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য ফোনালাপ এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন ডিনদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেও সংকটের অবসান হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপিপন্থি তিনটি শিক্ষক সংগঠন প্রশাসনের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। তাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে মব পরিস্থিতি তৈরি করে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের হেনস্তা করা হচ্ছে, যা শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নিরাপত্তা শঙ্কায় কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণাও দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ছাত্রদল ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে পরিকল্পিত অরাজকতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, একজন ছাত্রনেতার কাছ থেকে এ ধরনের ভাষা ও আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যেও উদ্বেগ স্পষ্ট। অনেকের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামো ও ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ক্রমেই জাতীয় রাজনীতির প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা শিক্ষাঙ্গনের মৌলিক উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
সব অভিযোগের জবাবে রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার নিজেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থানকারী হিসেবে তুলে ধরছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই তার সব কার্যক্রম। তবে চলমান উত্তেজনার মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কবে আবার স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশে ফিরবে—সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক