আঠারো মাস কারাভোগ এবং প্রায় সতেরো বছর বিদেশে অবস্থানের পর আবারও সশরীরে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে তারেক রহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন বিদেশ থেকে দল পরিচালনা করলেও দেশে ফিরে তাকে এখন মুখোমুখি হতে হচ্ছে বাস্তব রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত নানা চ্যালেঞ্জের।
২০০৭ সালে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আঠারো মাস কারাগারে ছিলেন তারেক রহমান। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দেড় বছর ধরেই তার দেশে ফেরার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময় দেশে না আসায় তার বিরুদ্ধে সমালোচনাও হয়।
অবশেষে এমন এক সময়ে দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান, যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। তার প্রত্যাবর্তনের দিন ঢাকার বিমানবন্দর ও পূর্বাচলের সংবর্ধনাস্থলে নেতাকর্মীদের বিপুল উপস্থিতি দলের ভেতরে প্রত্যাশার মাত্রা স্পষ্ট করেছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ
দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে চলাচলের প্রতিটি ধাপে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা লক্ষ্য করা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নিরাপত্তা জনসংযোগ ও মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে।
দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোও তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি তার পাসপোর্ট, যুক্তরাজ্যে অবস্থানের আইনি মর্যাদা এবং আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মনে করেন, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা না এলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের জন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। অতীতে ‘হাওয়া ভবন’ সংশ্লিষ্ট অভিযোগসহ বিএনপির শাসনামলের স্মৃতি জনগণের মনে এখনো আছে বলেও মত দেন অনেক বিশ্লেষক।
রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিকভাবে তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ ইতোমধ্যে দলটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আইন ও সালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৬৬ জন নিহত এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। এই বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা তারেক রহমানের জন্য বড় পরীক্ষা।
তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগে সাত হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী মনোনয়ন ঘিরে বিদেশফেরত ঘনিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দেশে দীর্ঘদিন আন্দোলনে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষা করা নির্বাচনের আগে সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির জন্য মনোবল বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও, জনআস্থা পুনরুদ্ধার ও দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই কেবল তার নেতৃত্বের সাফল্য নির্ধারিত হবে। সামনে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক দক্ষতা ও সিদ্ধান্তই হয়ে উঠবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কসমিক ডেস্ক