২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি এবং কৃষি খাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম।
একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, যদি রাজস্বনীতি যথাযথভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ড. জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, একদিকে সুদের হার বৃদ্ধি করে বাজার থেকে অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টেনে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আবার বাজারে প্রবেশ করছে। এই পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমিয়ে আনা সহজ নয়।
তিনি বিশেষভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও এ হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত চার বছর ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৪২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে ২.৭২ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের কৃষি খাতের গড় প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকা উদ্বেগের বিষয় বলে তিনি মনে করেন।
ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়। সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, বাজারে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের সক্ষমতা সীমিত। কারণ সরকারি মজুদের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি খাতে খাদ্যশস্যের মজুদ অনেক বেশি। ফলে বাজারে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বেশি থাকে।
তিনি বলেন, সরকারের হাতে যদি আরও বেশি মজুদ ও বাজারে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা থাকত, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, সার এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। এরই মধ্যে চালের দাম প্রতি কেজিতে কয়েক টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু আর্থিক নীতি নয়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কসমিক ডেস্ক