ডাইনোসর যুগের সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ংকর শিকারিদের মধ্যে অন্যতম হলো টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স। প্রায় ৪০ ফুট লম্বা এই বিশাল মাংসাশী প্রাণীর দেহ যতটা ভয়ংকর ছিল, তার তুলনায় সামনের দুই হাত ছিল অত্যন্ত ছোট, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণায় এই দীর্ঘদিনের রহস্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে। সেখানে বলা হয়েছে, টি-রেক্সের ছোট হাতের পেছনে মূল কারণ হতে পারে তাদের মাথার খুলির অসাধারণ শক্তি ও চোয়ালের বিবর্তন।
বিজ্ঞানীদের মতে, বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যখন কোনো প্রাণীর একটি নির্দিষ্ট অংশ—এ ক্ষেত্রে মাথা ও চোয়াল—অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে ওঠে, তখন শরীরের অন্য অংশগুলোর ব্যবহার কমে যায়। সময়ের সাথে সাথে সেই অংশগুলো সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। টি-রেক্সের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, টি-রেক্স বড় শিকারকে কাবু করতে তাদের বিশাল মাথা ও শক্তিশালী চোয়ালের ওপর নির্ভর করত। ফলে সামনের হাতের ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়। ধীরে ধীরে বিবর্তনের ধারায় সেই হাতগুলো ছোট হয়ে আসে। গবেষকরা এটিকে বিবর্তনের একটি ধরনের “শক্তি বিনিময়” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে একটি অঙ্গ শক্তিশালী হতে গিয়ে অন্য অঙ্গের বিকাশ সীমিত হয়ে পড়ে।
এই গবেষণায় ৮৫ প্রজাতির ডাইনোসরের ফসিল ও কঙ্কাল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা বিভিন্ন প্রজাতির কামড়ের শক্তি এবং মাথার খুলির গঠন পরীক্ষা করে একটি নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতি তৈরি করেন। ফলাফলে দেখা যায়, যেসব মাংসাশী ডাইনোসরের মাথার কাঠামো বেশি শক্তিশালী ছিল, তাদের সামনের হাত তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল।
শুধু টি-রেক্সই নয়, আরও কয়েকটি মাংসাশী ডাইনোসরের মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বাস করা এসব প্রজাতির মধ্যে পারস্পরিক কোনো সম্পর্ক না থাকলেও তাদের শরীরের এই বৈশিষ্ট্য এক ধরনের মিল দেখিয়েছে, যা বিবর্তনের একটি সাধারণ ধারা নির্দেশ করে।
গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, টি-রেক্স আসলে তার দৈনন্দিন জীবনে প্রধানত মাথা ও চোয়ালের ওপর নির্ভর করত। শিকার ধরা, আক্রমণ করা কিংবা হত্যা করার মতো কাজগুলোতে হাতের ভূমিকা ছিল খুবই সীমিত। তাই সময়ের সাথে সাথে হাতের কার্যকারিতা কমে গিয়ে তা ছোট হয়ে যায়।
তবে গবেষণায় এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ছোট হলেও টি-রেক্সের হাত পুরোপুরি অকেজো ছিল না। এগুলো শিকারকে ধরে রাখা, শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা কিংবা প্রজননকালীন আচরণে কিছু ভূমিকা রাখতে পারে—এমন ধারণাও রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
এই নতুন ব্যাখ্যা টি-রেক্সের শারীরিক গঠন ও বিবর্তন নিয়ে চলমান বহু বছরের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে আরও ফসিল বিশ্লেষণ ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই রহস্য সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
কসমিক ডেস্ক