ভারতের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। শুরুটা হয়েছিল একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সীমা ছাড়িয়ে বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য থেকে। একটি মামলার শুনানিতে তিনি কিছু তরুণকে ‘তেলাপোকার মতো’ বলে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল এমন এক শ্রেণির তরুণদের দিকে, যারা কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদ জানায়।
এই মন্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তরুণ অভিজিৎ দীপক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। শুরুতে বিষয়টি অনেকের কাছে ব্যঙ্গাত্মক বা হাস্যরসের অংশ মনে হলেও দ্রুতই এটি ক্ষুব্ধ তরুণদের একটি প্রতীকী আন্দোলনে রূপ নেয়।
দলের মূল বার্তা ছিল— সমাজ বা রাষ্ট্র যাদের গুরুত্বহীন মনে করে, তারাও নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে পারে। তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করার পেছনে ছিল টিকে থাকার ধারণা। অবহেলিত হলেও সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন— এই বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে সংগঠনটি।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সিজেপি অনলাইনে ব্যাপক সমর্থন পায়। পরে শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম, চাকরির সংকট এবং বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে আন্দোলনে নামে সংগঠনটি। নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা জাতীয় গণমাধ্যমেরও নজর কাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস বা অন্যান্য বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যে ধরনের রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করা যায়, সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত তরুণদের এমন বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলনের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি কঠিন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই আন্দোলন কি সত্যিই বিজেপি বা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য বড় রাজনৈতিক হুমকি? বাস্তবতা হলো, সাংগঠনিক শক্তি, নির্বাচনী প্রভাব এবং জনসমর্থনের বিচারে সিজেপি এখনো জাতীয় রাজনীতির বড় খেলোয়াড় নয়। বিজেপির মতো বিশাল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আন্দোলনের প্রভাব সবসময় নির্বাচনী শক্তি দিয়ে মাপা যায় না। অনেক সময় একটি প্রতীক, একটি স্লোগান বা একটি সামাজিক প্রবণতা বৃহত্তর জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। সিজেপি সেই জায়গাতেই আলোচনায় এসেছে।
অভিজিৎ দীপকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের আন্দোলনের মূল শক্তি হলো তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব, সুযোগের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা। যদি এসব প্রশ্নের কার্যকর সমাধান না আসে, তাহলে ককরোচ জনতা পার্টির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আরও জনপ্রিয় হতে পারে।
অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা সবসময় বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয় না। অনেক অনলাইন আন্দোলনই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। ফলে সিজেপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা কতটা সংগঠিত হতে পারে এবং বাস্তব ইস্যুগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে সামনে আনতে পারে তার ওপর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ককরোচ জনতা পার্টি এখনো বিজেপির সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তবে এটি তরুণদের এক ধরনের অসন্তোষ, হতাশা ও প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তেলাপোকা সত্যিই হাতিকে পরাস্ত করতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক আলোচনা যে তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
কসমিক ডেস্ক