সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার হাওরাঞ্চলে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড় কৃষকদের জীবনে আবারও তৈরি করেছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। শনিবার দুপুরে করিমপুর ইউনিয়নের চান্দপুর গ্রামের মাঠে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় মাঠে শুকানোর জন্য রাখা ধান মুহূর্তেই দমকা হাওয়ার তাণ্ডবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। স্বস্তির আবহাওয়া মুহূর্তেই রূপ নেয় ভয়াবহ দুর্যোগে।
স্থানীয় কৃষক নেপাল দাস কিছুক্ষণ আগেই হালকা রোদ দেখে মাঠে ধান শুকাতে দিয়েছিলেন। কিন্তু আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনে আকাশ কালো হয়ে ওঠে এবং শুরু হয় তীব্র বাতাসসহ কালবৈশাখী ঝড়। মুহূর্তের মধ্যে ধান উড়ে যেতে থাকে চারদিকে। একা পড়ে যাওয়া কৃষক নেপাল দাস তখন দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং দ্রুত ধান বাঁচানোর চেষ্টা করতে থাকেন।
এই সংকটময় মুহূর্তে আশপাশের কৃষক ও কৃষাণীরা এগিয়ে আসেন। কেউ কাস্তে হাতে, কেউ খালি হাতে—সবাই মিলে ঝড়ের মধ্যেও ধান একত্র করার চেষ্টা করেন। তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা স্থানীয়ভাবে মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। ঝড় থামার আগেই অনেক ধান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, ফলে বড় ধরনের ক্ষতি কিছুটা হলেও এড়ানো যায়।
কৃষক নেপাল দাস বলেন, কৃষিকাজ এখন প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত এক ধরনের যুদ্ধের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো তীব্র রোদ, কখনো ঝড়-বৃষ্টি—সবকিছুর মধ্যেই ফসল রক্ষা করতে হয়। তিনি জানান, এবারের মৌসুমে শ্রমিক সংকট এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
একই গ্রামের কৃষানি মায়া রানী দাস জানান, ধান কাটার পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ থাকে আবহাওয়ার ওপর। সামান্য বৃষ্টি বা ঝড় এলেই পুরো পরিশ্রম নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। তিনি বলেন, স্থানীয়রা একসঙ্গে এগিয়ে না এলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেত।
এছাড়া স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করেন, উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়লেও ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ ধান ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। ফলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলে শ্রমিক সংকটও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক সময় সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয় না, আবার জমিতে কাদা ও পানির কারণে হারভেস্টার মেশিনও ব্যবহার করা যায় না। এতে সময় ও খরচ দুইই বেড়ে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনোরঞ্জন অধিকারী জানান, হাওর এলাকায় এ ধরনের আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি স্বাভাবিক হলেও এটি কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে দ্রুত ফসল ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ৩৯ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সব মিলিয়ে দিরাইয়ের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবন শুধু পরিশ্রম নয়, প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই। ঝড়, বৃষ্টি আর বাজারের অস্থিরতার মাঝেও তারা ফসল ঘরে তোলার সংগ্রামে অবিচল থাকছেন।
কসমিক ডেস্ক