যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ বিরতির পর আবারও শুরু হয়েছে স্থানীয় নির্বাচন। বহু বছর পর ভোটের সুযোগ পেয়ে আনন্দে মেতে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ভোটকেন্দ্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো গাজাকে স্থানীয় নির্বাচনের আওতায় আনা হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন হাজার হাজার ভোটার, যারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাখা হয়েছে দেইর আল-বালাহ শহরকে। পশ্চিম তীরে অবস্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই শহরকে প্রতীকীভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আরও জোরালো হয়।
২০০৭ সালে গাজা থেকে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক গোষ্ঠী Hamas ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অঞ্চলটি আলাদা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরপর দীর্ঘ সময় গাজায় কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
বর্তমান নির্বাচনে গাজার দেইর আল-বালাহ শহরের বাসিন্দারা ভোট দিচ্ছেন, যেখানে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। একজন ভোটার বলেন, “জন্মের পর থেকেই আমরা নির্বাচন সম্পর্কে শুনে আসছি। এবার অংশ নিতে পেরে ভালো লাগছে।”
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যানার, পোস্টার এবং অস্থায়ী তাঁবুতে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কেন্দ্রে অস্থায়ী ব্যবস্থায় ভোট নেওয়া হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাজার অন্যান্য অংশে ব্যাপক ধ্বংসের কারণে ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি। বর্তমানে গাজার অর্ধেক অংশ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি অংশ Hamas-এর প্রশাসনের অধীনে রয়েছে।
এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনা চলছে। পশ্চিমা ও আরব দেশগুলো মনে করছে, গাজায় পুনরায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। পাশাপাশি পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমসহ একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
Palestinian Authority বলছে, এই নির্বাচন ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াবে।
তবে সব রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। কিছু দল নির্বাচন বর্জন করেছে, কারণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রার্থীদের কিছু শর্ত মেনে চলার কথা বলেছে, যার মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
যদিও Hamas আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী দেয়নি, তবে স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু তালিকা তাদের সমর্থিত হতে পারে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে এবং ভোটগ্রহণে বাধা দেবে না।
নিরাপত্তার জন্য ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রায় ৭০ হাজার ভোটার শুধু গাজা থেকেই এবং মোট এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্বাচন কেবল স্থানীয় প্রশাসনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। তবে গাজায় চলমান সংকট ও বিভাজনের কারণে এই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজায় ভোটের এই আয়োজন একটি বিরল রাজনৈতিক মুহূর্ত তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
কসমিক ডেস্ক