২০২৫ সাল বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে এক ভয়াবহ অচলাবস্থা, নীতিগত ব্যর্থতা এবং ধারাবাহিক সংকটের বছর হিসেবে। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—সব স্তরের শিক্ষা কার্যক্রমই ছিল আন্দোলন, ধর্মঘট, নীতির বারবার পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতায় বিপর্যস্ত। দেশজুড়ে শিক্ষক আন্দোলন, শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এবং সরকারের নীতি পরিবর্তনের কারণে পুরো বছরজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যত স্থবির ছিল।
দীর্ঘদিনের শিক্ষক আন্দোলনের ফলে দেশের প্রায় ১ কোটি প্রাথমিক শিক্ষার্থী সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছে। নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকা, পাঠ্যসূচি অসম্পূর্ণ থাকা এবং পরীক্ষা অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীদের শেখার ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব বহন করবে।
শিক্ষা খাতে যখন গভীর শেখার সংকট চলছে, ঠিক তখনই প্রাথমিক শিক্ষার বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিদ্যালয় অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাসামগ্রী—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
২০২৫ সালে বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক। এইচএসসি পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৮.৮৩ শতাংশে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এসএসসি পাসের হারও কমে ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ফলাফল স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়—শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও প্রকৃত অর্থে শেখার সুযোগ পায়নি।
নরসিংদীর এক গ্রামের বাসিন্দা আহমেদ মিয়া জানান, তার মেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি শেষ করলেও এখনো ঠিকভাবে বাংলা পড়তে পারে না। তার ভাষায়, “এখানে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করে, কিন্তু অনেকেই ঠিকমতো পড়তে পারে না।” অন্যদিকে পাশের গ্রাম সাতপাড়ার বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “স্কুল বন্ধ থাকলে ছেলেরা অপরাধে জড়াতে পারে, আর মেয়েদের বাল্যবিয়ে বাড়বে।”
শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় গ্রাম ও শহরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, শিশুশ্রমের ঝুঁকি, কিশোর অপরাধ ও বাল্যবিবাহ বেড়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, স্কুল বন্ধ মানেই ভবিষ্যতে সমাজে অপরাধ ও বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা।
২০২৫ সালের এই শিক্ষা সংকট কেবল আন্দোলনের ফল নয়—এটি মূলত শিক্ষা খাতে শাসনব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার প্রতিফলন। প্রতিবেদনে সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যায় দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষক আন্দোলন, সরকারের কঠোর অবস্থান ও দমননীতি, পাঠ্যক্রম নীতিতে বারবার পরিবর্তন এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতা। এর ফলে পুরো শিক্ষাবর্ষ কার্যত ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
কসমিক পোস্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র নয়। আজকের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে। ২০২৫ সাল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—সংস্কার ছাড়া, দূরদর্শী নীতি ছাড়া শিক্ষা খাতকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
কসমিক ডেস্ক