ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যাদের প্রতিভা কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে সাফল্য ধরা দেয় না। ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার Neymar Jr. ঠিক তেমনই এক নাম, যার ক্যারিয়ার জুড়ে রয়েছে জাদুকরী মুহূর্ত, কিন্তু বিশ্বকাপের গল্প বারবার ভরে উঠেছে হতাশা, চোট আর অপূর্ণ স্বপ্নে।
২০১০ বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের প্রথম সুযোগ। তখন তিনি তরুণ প্রতিভা হিসেবে সান্তোসে আলো ছড়াচ্ছিলেন। পুরো ব্রাজিল তখন চেয়েছিল তাকে দলে দেখা যাক। কিন্তু কোচ দুঙ্গা তাকে স্কোয়াডে রাখেননি। সেখান থেকেই শুরু হয় বিশ্বকাপের সঙ্গে তার দীর্ঘ জটিল সম্পর্ক।
২০১৪ সালে নিজের দেশে বিশ্বকাপ ছিল নেইমারের জন্য স্বপ্নপূরণের মঞ্চ। শুরুটাও হয়েছিল দুর্দান্তভাবে। তবে কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ভয়াবহ চোট তাকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়। সেই চোটের পর ব্রাজিল জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের লজ্জাজনক হার দেখে, যা ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে নেইমার ছিলেন তার ক্যারিয়ারের শীর্ষে। তবে এই টুর্নামেন্টে তার পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আলোচনায় আসে মাঠে তার নাটকীয় প্রতিক্রিয়া। মেক্সিকোর বিপক্ষে ফাউলের পর তার আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি এক ধরনের ‘মিম কালচারের’ অংশে পরিণত হন। তবুও তিনি গোল করেছিলেন এবং দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন, যেখানে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হেরে ব্রাজিল আবারও বিদায় নেয়।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল হয়তো সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়। প্রথম ম্যাচেই চোট পেয়ে ছিটকে যান তিনি, যদিও পরে ফিরে এসে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গোল করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে দুর্দান্ত এক গোল করে তিনি আবারও ব্রাজিলকে জয়ের পথে নিয়ে যান। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়ায় এবং ব্রাজিল বিদায় নেয়। কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমারের সেই ছবি বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপ এখন নেইমারের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য এই টুর্নামেন্টকে অনেকেই তার “শেষ সুযোগ” হিসেবে দেখছেন। বয়স, চোট এবং ফর্ম—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জ অনেক। তবুও তার অভিজ্ঞতা ও প্রতিভা এখনও তাকে বিশেষ করে তোলে।
বর্তমানে ব্রাজিল দলের নতুন পরিকল্পনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন কোচ Carlo Ancelotti। বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা এখনও নেইমারের আছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নেইমারের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ার একদিকে যেমন ব্যর্থতার গল্প, অন্যদিকে তেমনি লড়াইয়েরও প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি টুর্নামেন্টে তিনি নতুন করে শুরু করেছেন, আবার নতুন করে ভেঙে পড়েছেন।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং নেইমারের জন্য নিজের অসমাপ্ত গল্প শেষ করার শেষ অধ্যায় হতে পারে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই শেষ সুযোগ কি সত্যিই তাকে এনে দেবে সেই কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি, নাকি আবারও থেকে যাবে অপূর্ণ এক স্বপ্ন?
কসমিক ডেস্ক