ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিশ্ববাজারে তেলের দামে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন দেশ তাদের জরুরি মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার বিষয়ে সম্মত হলেও বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ধারা এখনো থামেনি।
সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয়। সংস্থাটির ৩২টি সদস্য দেশ মিলিতভাবে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো।
তবে এই ঘোষণার পরও তেলের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় দাম বাড়ার প্রবণতা থামছে না।
গত বুধবার ইরান থেকে নতুন করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে হামলার ঘটনা বাড়তে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–এর একজন মুখপাত্র জানান, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, তেলের দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখা সম্ভব নয় এবং পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দাম আরও বাড়তে পারে।
ওই মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, তেলের মূল্য অনেকটাই আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। তিনি ইঙ্গিত করে বলেন, এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর দ্রুত প্রভাব পড়ে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো বিশ্বব্যাপী জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলো মিলে বৈশ্বিক জ্বালানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উৎপাদন ও ব্যবহার করে থাকে। এই কারণে মজুদ তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক মার্টিন মা মনে করেন, আইইএর এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি মূলত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা। তার মতে, সরবরাহ নিয়ে ঝুঁকি যতদিন থাকবে ততদিন তেলের দামও বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে ব্যবসায়ীরাও সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী তেল বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। এই সপ্তাহের শুরুতে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামেও চাপ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিভিন্ন দেশেও দেখা যাচ্ছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৫০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
এদিকে এশিয়ার অনেক দেশ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও পরিস্থিতির প্রভাব অনুভব করছে। এই সপ্তাহে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের অনেক পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় থাইল্যান্ডে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ বেশিরভাগ সরকারি সংস্থার কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ফিলিপাইনও। জ্বালানি ব্যবহার কমাতে দেশটি চার দিনের কর্ম সপ্তাহ চালু করেছে। পাকিস্তানেও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অনুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে।
কসমিক ডেস্ক