১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবার প্রথমবারের মতো উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনায় বসেছে। ঐতিহাসিক এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘদিনের বৈরিতা, পরমাণু ইস্যু, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং একাধিক সামরিক সংঘাতের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে ২০১৮ সালে ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং সরাসরি আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মধ্যে পড়ায় নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
শনিবার বিকেলে ইসলামাবাদে শুরু হওয়া এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূতসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক। অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলও আলোচনায় অংশ নিতে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা হ্রাস এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে নৌচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা এবং সামরিক উত্তেজনা কমানো। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে দুই দেশের মধ্যে আস্থা সংকট এখনও বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। অতীতের সামরিক সংঘাত, গোপন অভিযানের অভিযোগ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এই আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে।
ইসলামাবাদে এই বৈঠককে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজর এখন পাকিস্তানের রাজধানীর দিকে।
বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আলোচনা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ৪৬ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ঐতিহাসিক বৈঠক শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কসমিক ডেস্ক