রাজপথে আবার কেন ফিরল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

রাজপথে আবার কেন ফিরল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 23, 2026 ইং
রাজপথে আবার কেন ফিরল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ছবির ক্যাপশন:

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় যে শব্দগুলো ছাত্রদের মুখে মুখে ফিরেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এবং ‘আজাদি’। সময়ের পরিক্রমায় রাজপথের আন্দোলন স্তিমিত হয়েছে, ছাত্ররা ফিরে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করেই এই শব্দগুলো আবার ফিরে এসেছে রাজনীতির মূল আলোচনায়।

সভা–সমাবেশ, রাজনৈতিক বক্তৃতা, এমনকি টেলিভিশনের টকশোতেও ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’, ‘বয়ান’, ‘মজলুম’—এ ধরনের শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ছে। কেউ কেউ এগুলোকে রাজনৈতিক বক্তব্যে জোরালোভাবে ব্যবহার করছেন, আবার সমালোচকদের একটি অংশ বলছে—বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দ বাদ দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবেই এসব শব্দ সামনে আনা হচ্ছে।

এই বিতর্ক এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে, সরকারের মন্ত্রী, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং বড় বড় রাজনৈতিক দলও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। একজন মন্ত্রী পর্যন্ত বলেছেন, এসব শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই—যা নতুন করে আলোচনার আগুনে ঘি ঢেলেছে।

তবে ভাষাবিদরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, ‘ইনকিলাব’, ‘আজাদি’ বা ‘ইনসাফ’-এর মতো শব্দগুলো বাংলা ভাষার কোনো বিকৃতি ঘটাচ্ছে না, আবার বাংলা ভাষার জন্য এগুলো কোনো হুমকিও নয়। তারা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তা, লেখা বা চিন্তায় এসব শব্দ খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না বলেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ার সময় এগুলো আলাদা করে নজরে আসছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি শব্দের গ্রহণ নতুন কিছু নয়। অতীতে ‘আওয়ামী’, ‘কমিউনিস্ট’, ‘ইউনিয়ন’-এর মতো শব্দ বাংলা ভাষার সঙ্গে এমনভাবে একীভূত হয়েছে যে সেগুলো এখন আর বিদেশি বলে মনে হয় না। এমনকি ‘ইত্তেফাক’ ও ‘ইনকিলাব’-এর মতো শব্দ দিয়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার নামকরণও হয়েছে, যা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণযোগ্য।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা শব্দটি হলো ‘ইনকিলাব’। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারী নেতাদের অনেকের বক্তব্যেই ‘আজাদি’, ‘ইনসাফ’, ‘বন্দোবস্ত’, ‘ফয়সালা’—এ ধরনের শব্দ শোনা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শব্দগুলো আন্দোলনের ভাষার অংশ হিসেবেই সামনে এসেছে।

অনেকের মতে, ‘ইনকিলাব’ শব্দটি নতুন করে আলোচনায় আসার পেছনে একটি বড় কারণ ছিল ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এর প্রতিষ্ঠাতা ওসমান হাদি নির্বাচনী প্রচারের সময় ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকেই শব্দটি রাজনীতিতে প্রতীকী গুরুত্ব পায়।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রায় সব নেতা তাদের বক্তব্যের শেষে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান ব্যবহার করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি-ও ব্যবহার করে, যার অর্থ—বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।

নতুন করে বিতর্ক তীব্র হয় যখন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জে ভাষা শহীদ দিবসের এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘বাংলাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না।’ তার এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুকে সরাসরি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ লিখে স্ট্যাটাস দেন। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে প্রশ্ন তোলেন—‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ শুনলে ব্লিডিং হয়?’

ছাত্রনেতা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারি লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ, চাঁদাবাজ মুর্দাবাদ।’ বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয় যখন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ফেসবুকে লেখেন, ‘ইনশাআল্লাহ আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’

ভাষাবিদদের অবস্থান এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, এসব শব্দ কোনোভাবেই ভাষার বিকৃতি নয়। তার মতে, বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সব শব্দই একসময় অন্য ভাষা থেকে এসেছে এবং ধ্বনিপদ্ধতি ও অর্থের পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা হয়ে উঠেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শব্দ যেন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিভাজনের হাতিয়ার না হয়—সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

সব মিলিয়ে, ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ বিতর্ক মূলত ভাষার চেয়ে রাজনীতির সঙ্গেই বেশি যুক্ত হয়ে পড়েছে। আর এই বিতর্কই প্রমাণ করছে—শব্দ শুধু ভাষার নয়, সময় ও ক্ষমতারও প্রতিফলন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নোয়াখালীতে ৫ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

নোয়াখালীতে ৫ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার