ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলার চিরাকুঠা গ্রামে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমরা বাসস্থান হারানোর সঙ্গে ভোটাধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ৪২ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি বোদিয়াত জামাল তার পরিবারের সঙ্গে গত সাত মাস ধরে ত্রিপল তাঙিয়ে বসবাস করছেন। গত বছরের জুলাই মাসে আসামের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজের কারণে ১৪০০ বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। যদিও অনেকেই গ্রাম ছাড়ে, জামাল পরিবার তার জায়গায় থেকে যায়।
গত সপ্তাহে আসামের নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করলে জামাল ও তার পরিবারের নাম বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। জামাল জানান, “গত ২৪ বছর ধরে আমি এখানে ভোটার। ভোট দিচ্ছি, কিন্তু এবার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ভোটার কার্ড ছাড়া কোথাও কাজ বা ভ্রমণ করা যায় না। এটি আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।”
জামাল ডিব্রুগড় জেলার কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ভোটার কার্ড না থাকায় বাইরে কাজে যেতে পারছেন না। তিনি আরও জানান, আসামের স্থানীয় অসমীয়া জনগোষ্ঠী তাদের ওপর হুমকি দিচ্ছে, যাতে বাঙালি মুসলিম কর্মীরা অন্যত্র চলে যায়। “সরকার একদিকে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙেছে, অন্যদিকে ভোটার আইডি কার্ডও কেড়ে নিয়েছে, ফলে আমরা পরিচয়হীন হয়ে পড়েছি,” বললেন জামাল।
চিরাকুঠা গ্রামের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে ১২১ বাঙালি মুসলিমের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ধুবড়ি ও উরিয়াম ঘাটে প্রায় ৫৭০০ মুসলিমকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে চারটি ভোটকেন্দ্র থেকে ৭৫৬ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। একইভাবে উরিয়াম ঘাটের ১৯ গ্রামের পাঁচটি ভোটকেন্দ্র থেকে ৪৯৪৫ ভোটারের নাম বাতিল করা হয়েছে।
এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, তার ওয়ার্ডের উচ্ছেদের কারণে ২০০ জনেরও বেশি বাঙালি মুসলিমের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিরা জানান, নির্বাচনি কর্মকর্তারা তাদের নাম তালিকায় ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
জামাল জানান, “আমি নির্বাচনি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু কোনো সদুত্তর পাইনি। চিরাকুঠা গ্রামের পরিবর্তে বীরসিংহ জাড়ুয়া নির্বাচনি এলাকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে, তবে এখনো তা গৃহীত হয়নি।”
২৫ জানুয়ারি পাঁচটি বিরোধী দল আসামের মুখ্য নির্বাচনি কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়, উচ্ছেদের ফলে বাস্তুচ্যুত প্রকৃত ভোটাররা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন না। আসামের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অনুরাগ গোয়েল অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের ‘স্বপ্রণোদিতভাবে’ বাদ দেওয়া হবে না। তিনি জানান, উচ্ছেদকৃতদের জন্য নতুন পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে।
তবে ধুবড়ি ও উরিয়াম ঘাটের বেশ কয়েকজন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির অভিযোগ, তাদের নাম কোনো স্থানে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। এর ফলে বাঙালি মুসলিমরা ভোটাধিকার এবং পরিচয়বিহীন হওয়ার পাশাপাশি কাজ এবং দৈনন্দিন জীবনেও সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
এই ঘটনা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার ও নির্বাচনি পর্যবেক্ষক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসস্থান উচ্ছেদ এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার এই পরিস্থিতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
কসমিক ডেস্ক