বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 20, 2026 ইং
বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ছবির ক্যাপশন:

বাংলা সাহিত্যের আকাশে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বর্ষীয়ান কথাসাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়, যিনি সাহিত্যাঙ্গনে ‘শংকর’ নামেই সমধিক পরিচিত, তিনি আর নেই। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা শংকর বাংলা কথাসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ধারার সূচনা করেছিলেন। তার দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি এমন সব উপন্যাস উপহার দিয়েছেন, যা শুধু পাঠকের মন জয় করেনি, বরং সময়ের সমাজচিত্রকে গভীরভাবে ধারণ করেছে। শহুরে জীবন, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, কর্পোরেট জগতের দ্বন্দ্ব এবং মানুষের অন্তর্লোকের সংকট—এই সবকিছুই তার লেখায় বাস্তব ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে চৌরঙ্গী, কত অজানা রে, সীমাবদ্ধ এবং জন অরণ্য। উপন্যাস চৌরঙ্গী-তে তিনি মহানগর কলকাতার এক ভিন্ন মুখ তুলে ধরেন—যেখানে ঝলমলে শহরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষের জীবনসংগ্রাম, একাকীত্ব ও সম্পর্কের জটিলতা অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে। এই উপন্যাস আজও বাংলা সাহিত্যের এক অনিবার্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত।

অন্যদিকে জন অরণ্য উপন্যাসে শংকর তুলে ধরেছেন মধ্যবিত্ত যুবসমাজের সংগ্রাম, নৈতিক সংকট এবং টিকে থাকার লড়াই। অর্থনৈতিক চাপে মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করার যন্ত্রণা তিনি নির্মোহভাবে উপস্থাপন করেছেন। সীমাবদ্ধ উপন্যাসে কর্পোরেট জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানুষের ভেতরের শূন্যতাকে গভীর দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। এসব রচনা বাংলা উপন্যাসকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, বরং চিন্তার নতুন দিগন্তও খুলে দিয়েছে।

শংকরের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শহরকেন্দ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের মনস্তত্ত্বকে মেলানো। তার ভাষা ছিল সহজ, কিন্তু গভীর; বর্ণনা ছিল সংযত, কিন্তু প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী। তিনি এমনভাবে চরিত্র নির্মাণ করতেন যে পাঠক সহজেই তাদের জীবনের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পেতেন।

তার প্রয়াণে সাহিত্য অঙ্গনে শোকের আবহ নেমে এসেছে। লেখক, পাঠক, শিল্পী—সবার মধ্যেই এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। তিনি উল্লেখ করেন, চৌরঙ্গী থেকে কত অজানা রে, সীমাবদ্ধ থেকে জন অরণ্য—শংকরের কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, শংকরের লেখনীর আঁচড়ে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের না-বলা কথা। বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তার গবেষণাধর্মী লেখা ও গ্রন্থগুলো বাঙালি চিন্তাধারায় এক মূল্যবান সংযোজন। তার মতে, এই প্রয়াণ শুধু একজন লেখকের মৃত্যু নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্য জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

শংকরের সাহিত্যকর্ম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তার অনেক উপন্যাস চলচ্চিত্র ও নাটকে রূপ পেয়েছে, যা তার জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবু তিনি নিজে ছিলেন নীরব, আড়ালে থাকা এক স্রষ্টা—যিনি আলোচনার চেয়ে লেখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি রয়ে গেছে। বাংলা সাহিত্যে শংকরের নাম উচ্চারিত হবে শহুরে জীবনের এক গভীর ভাষ্যকার হিসেবে। তার লেখা ভবিষ্যতেও পাঠককে ভাবাবে, প্রশ্ন তুলবে এবং সমাজকে নতুন করে দেখতে শেখাবে—এই বিশ্বাস নিয়েই সাহিত্যপ্রেমীরা তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সিরাজগঞ্জে পুকুর দ্বন্দ্বে দুই বিএনপি কর্মী নিহত, গ্রেপ্তার

সিরাজগঞ্জে পুকুর দ্বন্দ্বে দুই বিএনপি কর্মী নিহত, গ্রেপ্তার