ব্রহ্মপুত্র নদ–এর পানি কমতে শুরু করায় কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকায় মাছ ধরার চিত্রে এসেছে ভিন্ন মাত্রা। শুষ্ক মৌসুমে পানি হ্রাস পেয়ে ছোট ছোট নালা ও ‘দহ’ বা গর্তে মাছ আটকে পড়ায় স্থানীয় জেলেরা সহজেই বিভিন্ন দেশি প্রজাতির মাছ আহরণ করছেন।
সরেজমিনে রমনা ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফুটতেই জেলেরা বিভিন্ন ধরনের জাল নিয়ে নদের অগভীর অংশে নেমে পড়ছেন। বৈরালি, কাজলি, টাকি, পুঁটি, টেংরাসহ ছোট প্রজাতির মাছ বেশি ধরা পড়ছে। পানি স্বচ্ছ ও কম গভীর হওয়ায় মাছের ঘনত্ব বেড়েছে, ফলে জেলেদের জালে দ্রুত মাছ উঠছে।
স্থানীয় জেলে আসরাফুল (৫৫) জানান, পানি কমলে মাছ ধরা সহজ হয়, কিন্তু আগের মতো বড় মাছ আর পাওয়া যায় না। এখন ছোট মাছ দিয়েই সংসার চালাতে হচ্ছে। অপর জেলে ধলু রাম (৪৯) বলেন, আগে এই সময়ে নদীতে বেশি পানি থাকত, এখন অনেক জায়গায় বালুচর জেগে উঠছে। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক আবাস কমে গেছে।
নদী আন্দোলন কর্মী জাহানুর রহমান বলেন, পানি কমে যাওয়ায় মাছের চলাচল ও প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় ব্রহ্মপুত্র নদে অর্ধশতাধিক দেশি মাছের প্রজাতি ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক মাছ ভাটির দিকে সরে গেছে, আবার কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কম পানিতে সহজে মাছ ধরা পড়ায় শুষ্ক মৌসুমে জেলেরা আপাতদৃষ্টিতে লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ভয়াবহ সংকেত। মা মাছ ধরা পড়লে বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয় এবং ভবিষ্যতে মারাত্মক মাছ সংকট দেখা দিতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর নির্দিষ্ট কিছু গভীর অংশ সরকারিভাবে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে হবে। শুকনো মৌসুমেও সেখানে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত ড্রেজিং প্রয়োজন। এতে মাছের নিরাপদ আবাস ও প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বদরুজ্জামান মিঞা বলেন, পানি কমে গেলে মাছ সংকীর্ণ জায়গায় চলে আসে, যা জেলেদের জন্য ইতিবাচক দিক। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং উজানের পলি জমে নদের তলদেশ ভরাট হওয়া বড় সমস্যা। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে।
তিনি জানান, জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে যেন তারা ছোট পোনা মাছ না ধরে এবং ক্ষতিকর ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহার থেকে বিরত থাকে। ব্রহ্মপুত্র নদে অন্তত ১০টি খণ্ডকালীন অভয়াশ্রম স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ ও আইনি কাঠামোর আওতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নদীর ওপর নির্ভর না করে সমাজভিত্তিক খাঁচায় মাছ চাষ, বদ্ধ জলাশয়ে জলবায়ু সহিষ্ণু মাছের জাত চাষ এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তবেই প্রাকৃতিক নদীর ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ সম্ভব হবে।
ব্রহ্মপুত্র উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। তাই এর প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক, সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনাই এখন সময়ের দাবি।