ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিবেশে এবার কিছুটা ভিন্ন আবহে উদযাপিত হচ্ছে বসন্ত। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতিবছর ১ ফাল্গুনে ‘বসন্ত উৎসব’ আয়োজন করে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছরও আয়োজন করা হয়েছে ‘বসন্ত উৎসব-১৪৩২’। তবে স্থান পরিবর্তনের কারণে এবারের উৎসব ঘিরে আগ্রহ ও আলোচনার মাত্রা ছিল ভিন্ন।
বিগত বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বসন্ত উৎসবের আয়োজন হলেও এবার উৎসব হচ্ছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর–এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। ফলে ফাগুন বরণের পরিচিত পরিবেশে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে এ বছর প্রথম দিন নেই চিরাচরিত একুশের বইমেলা, তাই বরাবরের মতো নতুন বইয়ের ঘ্রাণে বসন্তকে স্বাগত জানানোর সুযোগও থাকছে না নগরবাসীর জন্য।
আজ সকাল সাড়ে ৭টায় বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের সমবেত যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীতের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। ভোরের কোমল আলো আর হলুদ-কমলা পোশাকে সেজে আসা মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবস্থল হয়ে ওঠে বর্ণিল ও প্রাণবন্ত।
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে রয়েছে নৃত্য ও সংগীত দলের পরিবেশনা, একক সংগীত, আবৃত্তি, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনা। বসন্তকে ঘিরে আয়োজন করা হয়েছে ‘বসন্ত কথন’, প্রীতি বন্ধনী ও আবির বিনিময়ের মতো ঐতিহ্যবাহী পর্বও। এসব আয়োজনে ফাগুনের রং ও সৌন্দর্য আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
‘বসন্ত কথন’ পর্বে সভাপতিত্ব করছেন পরিষদের সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ। বক্তব্য দিচ্ছেন সহসভাপতি কাজল দেবনাথ ও সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। তারা বসন্ত উৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য, ঐতিহ্য ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করেন।
উৎসবে অংশ নিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বহ্নিশিখা এবং সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী–সহ আরও বেশ কয়েকটি সংগীত ও নৃত্যদল। তাদের পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, লোকসংগীত ও নৃত্যনাট্যের বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে।
একক সংগীতে অংশ নিচ্ছেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী, সুচি দেবনাথ ও অনিমা রায়সহ অনেকে। আবৃত্তি পরিবেশন করছেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যয়, বেলায়েত হোসেন ও নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় রয়েছেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি ও আহসান দিপু।
বসন্ত উৎসব কেবল ঋতু পরিবর্তনের আনন্দই নয়, বরং এটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নান্দনিক চেতনার প্রকাশ। হলুদের আবির, ফুলের মালা, গান-নৃত্য আর আবৃত্তির মাধ্যমে প্রকৃতির নবজাগরণকে উদযাপন করা হয়। নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
স্থান পরিবর্তনের কারণে পরিবেশে কিছু ভিন্নতা থাকলেও উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্যে কোনো ঘাটতি নেই। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজন হওয়ায় নিরাপত্তা ও পরিসরের দিক থেকেও কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, ভিন্ন আবহে হলেও ফাল্গুনের প্রথম দিনকে ঘিরে রাজধানীতে বসন্তের রঙিন আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। গান, নৃত্য ও আবির বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মানুষ স্বাগত জানিয়েছে নতুন ঋতুকে।