পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় খণ্ডকালীন ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ ও নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিবেশ সুরক্ষা এবং রাজধানী ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এজন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি, পানি, জীববৈচিত্র্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও উপকূলীয় অঞ্চলসহ সব খাতকে একীভূত করে পদ্ধতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
শনিবার (১০ ডিসেম্বর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত ‘পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিশেষ অধিবেশনে এসব মতামত তুলে ধরেন বক্তারা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নগর উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ড. নজরুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন সিভিল ডিফেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম সাকিল নেওয়াজ, নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মো. শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী, কৃষিবিদ মো. শাহ কামাল খান, বাপার কোষাধ্যক্ষ জাকির হোসেন এবং বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির।
ভূমিকম্প ঝুঁকি প্রসঙ্গে এ কে এম সাকিল নেওয়াজ বলেন, ঢাকা শহর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং ভূমিকম্প অনিবার্য—তা ছোট বা বড় যেকোনো সময় হতে পারে। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণে নীতিমালা ও বিধি-বিধান মানা হয় না, অনুমোদিত নকশার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয় না। শহরের অধিকাংশ সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় জরুরি যান চলাচল ব্যাহত হয়। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনের বিস্ফোরণ ঝুঁকি, উদ্ধার সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে এখনই সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর তিনি জোর দেন।
নগর পরিকল্পনার বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। তার মতে, নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়ে বিদ্যমান নগর কাঠামোর পুনর্গঠন এখন বেশি জরুরি। পরিকল্পিত নগরায়ন, শহরের বিকেন্দ্রীকরণ এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মাধ্যমে নগর চাপ কমানো সম্ভব। পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ড. নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশের নানা সমস্যার কথা বহু বছর ধরে আলোচিত হলেও এ খাতে কোনো সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি। ফলে পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সমন্বিত পর্যালোচনা ও কার্যকর সুপারিশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, শুধু নীতিমালার সংস্কার যথেষ্ট নয়; পরিবেশ–সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি। এই সম্মেলনের সুপারিশের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সরকার নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে উদ্যোগ নেবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মোট সাতটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে বায়ু, শব্দ ও পানি দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ড. মাহবুব হোসেন। দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. নিয়ামুল নাসের। নগরায়ন, ভৌত পরিকল্পনা এবং পরিবহন ব্যবস্থা বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আরেকটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন তিস্তা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম সেলিম।
সম্মেলনে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ১১৭ জন বিশেষজ্ঞ পরিবেশ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত কর্মীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। দুই দিনের এই সম্মেলনে প্রায় ৫ শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলন শেষে পরিবেশ সংস্কার বিষয়ে একটি সুপারিশমালা প্রকাশ করার কথা রয়েছে।