দাঁতের সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত ব্রাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে টুথপেস্ট কেনার সময় অনেকেই টিউবের নিচে থাকা লাল, নীল, সবুজ বা কালো রঙের ছোট দাগ দেখে বিভ্রান্ত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে একটি দাবি প্রচলিত রয়েছে—সবুজ মানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, নীল মানে প্রাকৃতিক ও ওষুধযুক্ত, লাল মানে প্রাকৃতিক ও রাসায়নিকের মিশ্রণ এবং কালো মানে সম্পূর্ণ রাসায়নিক উপাদানে তৈরি টুথপেস্ট।
কিন্তু বাস্তবে এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টুথপেস্টের টিউবের নিচে থাকা এই রঙিন দাগগুলোর সঙ্গে পেস্টের উপাদান বা মানের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো মূলত উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত 'আই মার্ক' (Eye Mark) বা রেজিস্ট্রেশন মার্ক, যা স্বয়ংক্রিয় মেশিনকে নির্দিষ্ট স্থানে টিউব কাটা, ভাঁজ করা কিংবা সিল করার নির্দেশনা দেয়।
প্যাকেজিং লাইনে থাকা অপটিক্যাল সেন্সর বা লাইট সেন্সর এই রঙিন চিহ্ন শনাক্ত করে। এরপর মেশিন নির্ভুলভাবে টিউবের নিচের অংশ সিল ও কেটে দেয়। এজন্য বিভিন্ন কোম্পানি ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং মেশিনের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রং ব্যবহার করা হয়। তাই একই ধরনের টুথপেস্টেও বিভিন্ন রঙের চিহ্ন থাকতে পারে।
টুথপেস্টের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান
টুথপেস্টের কার্যকারিতা নির্ভর করে এর উপাদানের ওপর। সাধারণত একটি টুথপেস্টে থাকে—
- হিউমেক্ট্যান্ট (Humectant): পেস্ট শুকিয়ে যাওয়া রোধ করে। যেমন গ্লিসারল ও সরবিটল।
- অ্যাব্রেসিভ (Abrasive): দাঁতের ময়লা ও প্লাক পরিষ্কার করে। যেমন ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ও সিলিকা।
- বাইন্ডিং এজেন্ট: পেস্টের উপাদানগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে। যেমন কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজ ও জ্যান্থান গাম।
- ফ্লেভারিং এজেন্ট: পেস্টে সতেজ স্বাদ ও গন্ধ যোগ করে।
- ফ্লুরাইড: দাঁতের এনামেল শক্ত করে এবং ক্যাভিটি প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিভিন্ন ধরনের টুথপেস্ট
বর্তমানে বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী নানা ধরনের টুথপেস্ট পাওয়া যায়।
- হোয়াইটেনিং টুথপেস্ট: দাঁতের দাগ কমাতে সহায়তা করে।
- সেনসিটিভ টুথপেস্ট: দাঁতের শিরশিরানি কমানোর জন্য পটাশিয়াম নাইট্রেট বা অনুরূপ উপাদান থাকে।
- প্লাক বা টারটার কন্ট্রোল টুথপেস্ট: মাড়ির সমস্যা ও প্লাক কমাতে বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়।
- হারবাল বা প্রাকৃতিক টুথপেস্ট: বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ নির্যাস ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি হলেও সব স্বাস্থ্যগত দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত নয়।
টুথপেস্ট কেনার সময় কী দেখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, টুথপেস্ট কেনার সময় টিউবের নিচের রঙিন দাগ নয়, বরং নিচের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া উচিত—
- মেয়াদ (Expiry Date)
- উপাদানের তালিকা
- ফ্লুরাইড রয়েছে কি না
- অনুমোদিত মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সিল
- নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী (সেনসিটিভ, হোয়াইটেনিং, হারবাল ইত্যাদি) টুথপেস্ট নির্বাচন
সবশেষে বলা যায়, টুথপেস্টের টিউবের নিচে থাকা লাল, নীল, সবুজ বা কালো রঙের দাগ কোনোভাবেই পেস্টের রাসায়নিক বা প্রাকৃতিক উপাদান নির্দেশ করে না। এটি শুধুই উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি প্রযুক্তিগত চিহ্ন। তাই টুথপেস্ট বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত বিভ্রান্তিকর তথ্য নয়, বরং উপাদান, গুণগত মান এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
কসমিক ডেস্ক