বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার। তাদের সর্বশেষ বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। ২০০২ সালে জরিপ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের প্রতি অনুকূল মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপে বিশ্বের ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচকভাবে দেখেন। ফলাফলে দেখা যায়, ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি।
অন্যদিকে মাত্র ছয়টি দেশে—ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড ও ইসরায়েল—যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের তুলনায় বেশি ইতিবাচক মূল্যায়ন পেয়েছে। এই দেশগুলোর অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হিসেবে পরিচিত।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক জনাথন শুলম্যান বলেন, গত দুই দশকে বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমলেও এবারই প্রথম এত বেশি দেশে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। তার মতে, অতীতে বিশেষ করে ২০০৮ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের শেষ দিকে এবং ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি দুর্বল হয়েছিল। তবে তখনও চীনের জনপ্রিয়তা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সমান কিংবা কিছুটা কম ছিল।
জরিপে দেখা যায়, স্পেন, ইতালি, গ্রিস, কানাডা ও ইন্দোনেশিয়ায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া মেক্সিকো, কলম্বিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনকে তুলনামূলক বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হলেও উন্নত দেশগুলোর অনেকটিতে চীনের প্রতি সন্দেহ ও নেতিবাচক মনোভাব এখনো রয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর, যেখানে উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও চীনের গ্রহণযোগ্যতা শক্তিশালী।
দেশভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেছে পাকিস্তানে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। বিপরীতে সবচেয়ে কম ইতিবাচক মত এসেছে জাপান থেকে, যেখানে মাত্র ১১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
জরিপে বিশ্ব নেতাদের প্রতিও মানুষের আস্থার বিষয়টি মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি চিনপিং—দুজনের প্রতিই আস্থার হার অধিকাংশ দেশে ৫০ শতাংশের নিচে। তবে অনেক দেশেই ট্রাম্পের তুলনায় শি চিনপিংয়ের ওপর তুলনামূলক বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।
শি চিনপিংয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা দেখা গেছে পাকিস্তানে, যেখানে ৮৩ শতাংশ মানুষ তার নেতৃত্বের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের প্রতি সর্বোচ্চ আস্থা দেখা গেছে ফিলিপাইনে। বিপরীতে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ট্রাম্পের প্রতি আস্থার হার ছিল সবচেয়ে কম।
জরিপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে চীনের তুলনায় এগিয়ে। তবে এই ব্যবধান আগের তুলনায় কমে এসেছে। আবার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মধ্যম আয়ের অনেক দেশের মানুষ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করে, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে এমন ধারণা তুলনামূলক কম।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এসব কারণ বৈশ্বিক জনমত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। তবে একই সঙ্গে মানবাধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোতে চীন ও শি চিনপিংকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও এখনো বহাল রয়েছে।
কসমিক ডেস্ক