টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার আশঙ্কা বাড়লেও ফেনীতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বন্যার ঝুঁকি কমিয়ে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের লক্ষ্যে ফেনীর সোনাগাজীর মুহুরী সেচ প্রকল্পের ৪০টি রেগুলেটর দরজা প্রায় দুই মাস ধরে খোলা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত ১০টি অভ্যন্তরীণ স্লুইস গেটও খোলা রয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) রাতে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শিহাব আহাম্মেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এটি কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং বর্ষা মৌসুমে পানি ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক ও পরিকল্পিত কার্যক্রমের অংশ।
তিনি বলেন, প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে মুহুরী সেচ প্রকল্পের গেটগুলো বন্ধ রাখা হয়। ধান চাষের মৌসুমজুড়ে গেট বন্ধ থাকার পর বর্ষা শুরু হওয়ার আগে এপ্রিলের শেষ দিকে নিয়ম অনুযায়ী সব দরজা খুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে বর্ষা মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো খোলা থাকে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে পানির চাপে রেগুলেটরের গেট খুলে দেওয়া হয়েছে বলে যে তথ্য ছড়িয়েছে, তা সঠিক নয় বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, গেট খোলা রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ নিয়মিত পরিচালন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে, যাতে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীপথ হয়ে বঙ্গোপসাগরে নেমে যেতে পারে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, জোয়ারের সময় ফেনী নদীর দিক থেকে উল্টো স্রোতের পানি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য রেগুলেটরের ফ্ল্যাপ গেটগুলো পানির চাপের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। আবার জোয়ার শেষ হলে পানির চাপ কমে গেলে গেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। ফলে আলাদাভাবে পরিচালনার প্রয়োজন হয় না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মুহুরী সেচ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছিল ফেনী নদী ও কালিদাস পাহালিয়া নদীর সম্মিলিত পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বর্ষাকালে বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। প্রকল্পের ৪০ ভেন্টবিশিষ্ট রেগুলেটর বর্ষায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে রেগুলেটরের পাশাপাশি সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খালের সঙ্গে সংযুক্ত ১০টি অভ্যন্তরীণ স্লুইস গেটও খোলা রাখা হয়েছে, যাতে ভেতরের পানি দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয়।
পাউবোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ১১টায় মুহুরী নদীর পানির স্তর ছিল ১০ দশমিক ১৪ মিটার, যা এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। একই সময়ে মুহুরী রেগুলেটর এলাকার পানির স্তরও স্বাভাবিক পর্যায়ে ছিল।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, শনিবার রাত ৯টার পর থেকে নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত তা বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মেরামত কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, যদি নদীর পানি ১২ দশমিক ৫৫ মিটার বিপৎসীমা অতিক্রম করে, তাহলে নতুন করে কয়েকটি এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তবে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে ফেনী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) জেলায় ৪৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৪৮ ঘণ্টায়ও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নদ-নদীর পানির স্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কসমিক ডেস্ক