ভারত ও ইসরায়েলের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাহিদা বাড়তে থাকায় ইসরায়েল এবার ভারতের মাটিতে তাদের অত্যাধুনিক ‘আয়রন ডোম’ (Iron Dome) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ‘তামির’ (Tamir) উৎপাদনের জন্য একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইসরায়েলের শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস ভারতের কয়েকটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে তামির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি, তবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তামির ক্ষেপণাস্ত্র হলো আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, মর্টার শেল এবং ড্রোন শনাক্ত করে আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম। ইসরায়েলের বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আয়রন ডোমকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপিত হলে রাফায়েল বৈশ্বিক বাজারে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ আরও বাড়াতে পারবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এই উদ্যোগকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনা ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রতিরক্ষা উৎপাদন কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশীয় শিল্পে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তর, যৌথ উৎপাদন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারত নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারত ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। দুই দেশ নজরদারি প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, ড্রোন, রাডার এবং বিভিন্ন আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে একাধিক প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করছে। নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে রাফায়েল উত্তর ইসরায়েলের একটি কারখানায় আয়রন ডোমের তামির ইন্টারসেপ্টর তৈরি করে। এছাড়া গত বছর প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রেথিয়ন-এর সঙ্গে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও তামির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে। সেই উৎপাদন কেন্দ্র মার্কিন মেরিন কোরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি প্রয়োজনে ইসরায়েলের উৎপাদন সক্ষমতাকেও সহায়তা করছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের আরেক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস ইতোমধ্যে ভারতে হার্মিস-৯০০ ও হার্মিস-৪৫০ ড্রোন উৎপাদন করছে। এই সহযোগিতা দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে আয়রন ডোমের ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন শুরু হলে তা শুধু ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এটি ভারতকে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
যদিও প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোলে ভবিষ্যতে এটি ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্বের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্পে পরিণত হতে পারে।
কসমিক ডেস্ক