মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে গভীর জ্বালানি সংকটে পড়েছে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিউবা। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় দেশটির জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে এবং সোমবার (৬ জুলাই) প্রায় পুরো দেশই অন্ধকারে ডুবে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে এটি কিউবার প্রথম জাতীয় ব্ল্যাকআউট নয়; বরং চলতি বছর একাধিকবার একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে দেশটি।
কিউবার জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে জরুরি সেবা সচল রাখতে সীমিত পরিসরে বিকল্প ‘মাইক্রোসিস্টেম’ চালু করা হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রকৌশলী ও কারিগরি দল নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসা, যোগাযোগ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে কিউবা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। কিউবার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কারণে তাদের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলো থেকেও এখন তেল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর আগে ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকোসহ কয়েকটি দেশ থেকে কিউবা নিয়মিত জ্বালানি আমদানি করত। বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকি মূল্যে তেল সরবরাহ করত। তবে কিউবার দাবি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকির কারণে এসব দেশ এখন আর আগের মতো জ্বালানি রপ্তানি করতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সীমিত প্রবেশাধিকার থাকায় কিউবার জন্য বিকল্প উৎস থেকেও সহজে জ্বালানি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, জ্বালানি আমদানিতে বাধা দিয়ে কিউবার ভেতরে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার মতে, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ভিন্ন। ওয়াশিংটনের দাবি, অর্থনৈতিক চাপের উদ্দেশ্য কিউবার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা, অর্থনীতি আরও উন্মুক্ত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এসব পদক্ষেপ কিউবার জনগণের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
এদিকে কিউবার জাতীয় পরিষদ সম্প্রতি অর্থনীতি সংস্কারের লক্ষ্যে কয়েকটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব সংস্কার বিদেশি চাপের কারণে নয়; বরং দেশের অর্থনীতিকে আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই সংস্কারকে পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়েও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে উভয় পক্ষের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কিউবা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ কিউবার অর্থনীতিকে কঠিন অবস্থায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এখন দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কসমিক ডেস্ক