বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কবি আল মুজাহিদী আর নেই। শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর ২টায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবরে দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সাইফুল্লাহ মানসুর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতা ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী ছিলেন।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আল মুজাহিদী। তিনি এক সময় দেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ফলে তার জীবন শুধু সাহিত্যেই নয়, দেশের ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল।
তার সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। কবিতা ছিল তার প্রধান পরিচয় হলেও তিনি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ এবং শিশুসাহিত্যে সমান দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘হেমলকের পেয়ালা’, ‘ধ্রুপদ ও টেরাকোটা’, ‘যুদ্ধ নাস্তি’, ‘মৃত্তিকা অতি-মৃত্তিকা’, ‘প্রিজন ভ্যান’, ‘ঈডের হ্যামলেট’, ‘প্রাচ্য পৃথিবী’, ‘সৌর জোনাকি’, ‘আল মুজাহিদীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ এবং ‘আল মুজাহিদীর প্রেমের কবিতা’।
উপন্যাস সাহিত্যে তার গুরুত্বপূর্ণ রচনার মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম প্রেম’, ‘চাঁদ ও চিরকুট’, ‘লাল বাতির হরিণ’, ‘রুপোলি রোদ্দুর’, ‘আলোর পাখিটা’, ‘খোকার আকাশ’ এবং ‘খোকার যুদ্ধ’। গল্পগ্রন্থ হিসেবে পাঠকমহলে পরিচিত ‘প্রপঞ্চের পাখি’, ‘বাতাবরণ’ এবং ‘ভরা কটাল মরা কটালের চাঁদ’। শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। ‘হালুম হুলুম’, ‘তালপাতার সেপাই’, ‘শেকল কাটে খাঁচার পাখি’, ‘সোনার মাটি রূপোর মাটি’ এবং ‘ইস্টিশানে হুইসেল’ তার উল্লেখযোগ্য শিশুসাহিত্যকর্ম।
অনুবাদক হিসেবেও আল মুজাহিদীর অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি বিভিন্ন ভাষার কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তার অনুবাদগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কাইফি আজমির কবিতা’, ‘পৃথিবীর কবিতা’, ‘আহমদ ফরাজের কবিতা’, ‘উর্দু কবিতা’, ‘হিন্দি কবিতা’ এবং ‘হাইনরীশ হাইনের কবিতা’। এছাড়া ‘সমাজ ও সমাজতত্ত্ব’ নামে একটি প্রবন্ধগ্রন্থ এবং ‘কালান্তরের যাত্রী’ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জীবনানন্দ দাশ একাডেমি পুরস্কার, কবি জসীম উদ্দীন একাডেমি পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমি পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার, জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার, বাসাসপ কাব্যরত্ন পদকসহ একাধিক সম্মাননা অর্জন করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননাগুলোর একটি একুশে পদকে ভূষিত হন।
তার মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য অঙ্গন একজন বহুমাত্রিক স্রষ্টাকে হারালো। কবিতা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ তার কর্মজীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
কসমিক ডেস্ক