বন্ধ চিনিকল চালুর লক্ষ্যে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল পুনরায় চালুর পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে কার্যত থমকে গেছে। লোকসানের যুক্তিতে নতুন করে অর্থ বরাদ্দে সম্মতি না দেওয়ায় কবে নাগাদ মিল দুটি চালু হবে—তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে আখচাষি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে।
২০২৪ সালে গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো পুনরায় চালু ও লাভজনকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) মাড়াই স্থগিত থাকা চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে।
বিএসএফআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর করোনাকালে দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টিতে আখমাড়াই বন্ধ করে দেয় তৎকালীন সরকার। বন্ধ হওয়া মিলগুলোর মধ্যে ছিল শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকল। টাস্কফোর্সের সুপারিশে প্রথম ধাপে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকলে ২০২৭–২৮ মৌসুম থেকে আখমাড়াই শুরুর লক্ষ্যে তিন বছরে পর্যায়ক্রমে সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছর থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ ও ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য শ্যামপুর চিনিকলে ৫১ কোটি ৭০ লাখ এবং সেতাবগঞ্জ চিনিকলে ৬৬ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে গত বছরের ১৩ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠায়। তবে ৩০ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বিগত দুই দশকে বিএসএফআইসিকে বিপুল পরিমাণ পরিচালন ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানি হওয়ায় ভর্তুকি কমানোর নীতির অংশ হিসেবে মিলগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। এ কারণে নতুন করে অর্থ বরাদ্দে তারা সম্মত নয়।
টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, চিনিকল লাভজনক হতে অন্তত তিনটি মৌসুম সময় লাগে। কিন্তু দেরির কারণে দুটি মৌসুম নষ্ট হয়েছে। কৃষকের স্বার্থ ও দেশীয় শিল্প রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে এখনো লোকসানের অজুহাত দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
শ্যামপুর চিনিকল চালুর খবরে রংপুর অঞ্চলের আখচাষিদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। স্থানীয় আখচাষিরা জানান, একসময় যেখানে ছয় হাজার একর জমিতে আখ চাষ হতো, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৬০০ একরে। মিল চালুর আশায় অনেকেই পুনরায় আখ রোপণ করলেও এখন তারা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
সরেজমিনে শ্যামপুর চিনিকলে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানার ভেতর-বাইরে আগাছা আর সুনসান নীরবতা। একসময় যেখানে শত শত শ্রমিক কাজ করতেন, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকজন কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন।
শ্যামপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানান, বাজেট কমিয়ে পুনরায় অর্থ চাওয়া হলেও এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। সেতাবগঞ্জ সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ চললেও অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, দ্রুত বিনিয়োগ না হলে শুধু চিনিকল নয়, সংশ্লিষ্ট কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বে।
কসমিক ডেস্ক