মৌলভীবাজার জেলায় টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে নদ-নদী ও হাওরাঞ্চলের পানি পরিস্থিতিতে মিশ্র চিত্র দেখা দিয়েছে। জেলার জুড়ী নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হলেও মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবো সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে একই সময়ে মনু নদীর পানি রেলওয়ে সেতুর কাছে বিপৎসীমার ৩৭৫ সেন্টিমিটার নিচে এবং চাঁদনীঘাট এলাকায় ২০৪ সেন্টিমিটার নিচে অবস্থান করছিল। ধলাই নদীর পানিও কমে বিপৎসীমার ২৭৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানিও শেরপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৩৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।
নদ-নদীর পানি কিছুটা কমলেও হাওরাঞ্চলে পরিস্থিতি এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। বিশেষ করে হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওরে বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সেচ পাম্পগুলো ঠিকমতো সচল না থাকা এবং কাশিমপুর পাম্প হাউজের গাফিলতির কারণে পানি নিষ্কাশন বিলম্বিত হয়েছে, যার ফলে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজারে মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর রয়েছে হাওর এলাকায়। ইতোমধ্যে হাওরে প্রায় ৮৫ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হলেও বাকি অংশ ও নিচু এলাকার ফসল এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
টানা বৃষ্টি এবং বজ্রপাতের কারণে অনেক কৃষক এখনো মাঠে নামতে পারছেন না। শ্রমিক সংকট ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ধান কাটা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায় পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। পাশাপাশি সবজি ক্ষেত ও আউশ ধানের বীজতলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, একদিকে বৃষ্টি অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পানি তাদের জীবন-জীবিকাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে। অনেকেই দাবি করছেন, সময়মতো পানি নিয়ন্ত্রণ ও ফসল কাটা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতি আরও কমানো যেত।
অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৮৯৭ হেক্টর ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তার মতে, পানি কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে এবং বৃষ্টি কমলে দ্রুত ফসল কাটা সম্ভব হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ জানান, বর্তমানে জেলার বেশিরভাগ নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও জুড়ী নদী এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে বলে তারা আশা করছেন।
সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারে নদ-নদীর পানি কমলেও হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবং পানি নিষ্কাশন ধীর হলে কৃষি ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক