সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় নির্মাণাধীন হরিমন বাঁধ ঘিরে এখন কৃষকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। প্রায় ২৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চলমান এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পটি এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি, এর মধ্যেই বাঁধের কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় হাওর এলাকার ফসল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে সম্প্রতি বাঁধের দুর্বল অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে খরচার হাওরে ঢুকে পড়ে। এতে আশপাশের হাজার হাজার একর জমির ধান ও ফসল হুমকির মুখে পড়েছে। খরচার হাওরে মোট ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি থাকলেও চলতি মৌসুমে প্রায় ৪ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে, যা এখন বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।
গত মঙ্গলবার সকালে উপজেলার রাধানগর গ্রামের পাশে বাঁধে একটি অংশ দিয়ে পানি ঢোকার খবর পাওয়া যায়। বিষয়টি জানার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে শ্রমিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের গর্ত বন্ধ করা হয় এবং আপাতত পানি আটকাতে বাঁধের ওপর পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এই মেরামত ব্যবস্থা সাময়িক এবং বাঁধটি এখনো স্থায়ীভাবে নিরাপদ নয়। তাদের অভিযোগ, নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সময়মতো মাটি ফেলা হয়নি, যথাযথভাবে কম্প্যাকশন বা দুরমুজ না করেই অনেক জায়গায় জিওটেক্সটাইল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এতে বাঁধের গঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন।
এছাড়া বাঁধের উচ্চতা পর্যাপ্ত নয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, যদি বড় ধরনের ভাঙন ঘটে তবে পুরো খরচার হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে যাবে, যার ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে স্থানীয় কৃষকরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় খরচার হাওর ও আঙ্গারুলি হাওরে প্রায় ১.৭ কিলোমিটার বাঁধ এবং দুটি ফ্লাড ফিউজ নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি আগামী জুন মাসের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
পাউবোর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বাঁধে তৈরি হওয়া ছিদ্রগুলো দ্রুত বন্ধ করা হয়েছে এবং হাওরে পানি প্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিলেট পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলীও জানান, বাঁধের কোথা দিয়ে পানি প্রবেশ করছিল তা শনাক্ত করে দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বাঁধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো। এর দুর্বলতার কারণে হাওরে পানি ঢুকলে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হবে। তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কঠোর নজরদারির কথা জানিয়েছেন।
পাউবো সুনামগঞ্জের প্রকৌশলীর মতে, বাঁধের কিছু অংশের ব্লকের ফাঁক দিয়ে পানি ঢুকেছিল, যা দ্রুত মেরামত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কঠোরভাবে তদারকি করা হচ্ছে এবং কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের একমাত্র ভরসা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাঁধের কাজ সম্পন্ন হওয়া, যাতে আসন্ন মৌসুমে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়।
কসমিক ডেস্ক