ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, আর আখিরাতই চূড়ান্ত ও স্থায়ী জীবন। সহিহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত হাদিসে (হাদিস: ৭০৮৮) এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত প্রভাবশালীভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে জান্নাত ও জাহান্নামের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দুনিয়ার সুখ-দুঃখের প্রকৃত স্বরূপ বোঝানো হয়েছে।
হাদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের মধ্য থেকে এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী জীবনযাপন করেছিল। তাকে একবার জাহান্নামে প্রবেশ করানোর পর জিজ্ঞেস করা হবে, সে কি কখনো দুনিয়াতে কোনো সুখ বা ভালো কিছু দেখেছে? তখন সে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে বলবে, আল্লাহর কসম! আমি কখনো কোনো সুখ বা কল্যাণ দেখিনি।
এরপর জান্নাতিদের মধ্য থেকে এমন একজনকে আনা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি দুঃখ-কষ্ট, বিপদ ও কষ্টের মধ্যে জীবন কাটিয়েছে। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর জিজ্ঞেস করা হবে, সে কি দুনিয়াতে কখনো কোনো দুঃখ-কষ্ট দেখেছে? সে উত্তরে বলবে, আল্লাহর কসম! আমি দুনিয়াতে কখনো কোনো দুঃখ বা কষ্টের মুখোমুখি হইনি।
এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে বোঝায় যে, আখিরাতের আনন্দ ও শাস্তি এতই গভীর ও বাস্তব যে দুনিয়ার সব অনুভূতি সেখানে বিলীন হয়ে যাবে। দুনিয়ার সুখ, সম্পদ, ক্ষমতা বা কষ্ট—সবই আখিরাতের তুলনায় অতি নগণ্য হয়ে যাবে।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যে, দুনিয়ার জীবন কখনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, “নিশ্চয়ই আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন” (সুরা আনকাবুত: ৬৪)। এই আয়াতও একই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে—দুনিয়া শুধু একটি পরীক্ষার স্থান, যেখানে মানুষের চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হবে আখিরাতে।
এই হাদিস মুমিনদের জন্য একটি বড় সান্ত্বনার বার্তা বহন করে। যারা দুনিয়াতে দারিদ্র্য, রোগ, নির্যাতন বা বিভিন্ন বিপদে পড়েন, তাদের জন্য এটি আশার আলো। কারণ যদি তারা ঈমান ও নেক আমলের ওপর স্থির থাকে, তবে আখিরাতে জান্নাতের এক মুহূর্তের সুখই তাদের সব দুঃখ-কষ্টকে সম্পূর্ণ ভুলিয়ে দেবে।
অন্যদিকে যারা দুনিয়াতে সুখ-সম্ভোগে ডুবে থাকে, তাদের জন্যও এটি সতর্কবার্তা। কারণ দুনিয়ার বিলাসিতা যদি আখিরাতে জাহান্নামের শাস্তির কারণ হয়, তবে সেই সমস্ত সুখের কোনো মূল্য থাকবে না।
এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার সুখে অহংকার করা এবং দুঃখে হতাশ হওয়া—দুটিই ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। প্রকৃত সফলতা হলো আখিরাতের সফলতা। একজন বুদ্ধিমান মুমিন তাই দুনিয়াকে চূড়ান্ত লক্ষ্য না বানিয়ে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
সবশেষে, এই হাদিস আমাদের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা দেয়—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই সর্বোচ্চ লক্ষ্য, আর জান্নাতই চূড়ান্ত সফলতা।
কসমিক ডেস্ক