গ্যাস সংস্থান ব্যর্থতায় বিদ্যুৎ–শিল্প–গৃহস্থালি সংকটে The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

গ্যাস সংস্থান ব্যর্থতায় বিদ্যুৎ–শিল্প–গৃহস্থালি সংকটে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jan 7, 2026 ইং
গ্যাস সংস্থান ব্যর্থতায় বিদ্যুৎ–শিল্প–গৃহস্থালি সংকটে ছবির ক্যাপশন:
ad728

আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বড় উন্নয়ন সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রয়োজনীয় গ্যাস সংস্থান নিশ্চিত না করেই একের পর এক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এরই ফল হিসেবে আজ দেশের জ্বালানি খাত চরম সংকটে পড়েছে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ গ্যাস সংকট।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় দেশীয় গ্যাস সংস্থান নিশ্চিত করা হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, পুরনো কূপ সংস্কার কিংবা গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান—সব ক্ষেত্রেই ছিল দীর্ঘসূত্রতা ও সিদ্ধান্তহীনতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৯ সালের পর থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকলেও সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনে ছিল আগ্রাসী। বিদ্যুৎ খাতে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য পেলেও জ্বালানি নিরাপত্তার সমন্বিত পরিকল্পনা উপেক্ষিত থেকেছে। ফলে আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও গ্যাসের অভাবে বহু কেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

গ্যাস ঘাটতি সামাল দিতে সরকার আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। তবে বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির উচ্চ মূল্য, ডলার সংকট এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি সম্ভব হয়নি। এর ফলে গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোকে রেশনিং ও সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প খাত। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় নিয়মিত গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমছে। অনেক কারখানায় সপ্তাহে কয়েক দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। এতে রফতানি আদেশ পূরণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

গৃহস্থালি পর্যায়েও সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে দিনের পর দিন চুলা জ্বলছে না। মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু সেখানে রয়েছে মূল্য অস্থিরতা ও সিন্ডিকেট। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। গ্যাস না পেয়ে সরকার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে বাধ্য হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়ছে এবং সরকারের আর্থিক চাপ বেড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন গত বছরের তুলনায় দিনে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে গিয়ে আবাসিক খাতে সংকট বেড়েছে। তাঁর মতে, এর একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং পুরনো কূপ সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জানুয়ারি দেশে গ্যাস উৎপাদন ছিল ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, যা আগের বছরের তুলনায় কম। উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় প্রকৃত উৎপাদন অনেক কম থাকায় সরবরাহ ঘাটতি বাড়ছে। অথচ মোট উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ গ্যাস আবাসিকে সরবরাহ করা হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট আকস্মিক নয়; এটি দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ফল। সময়মতো গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হলে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল।

বর্তমান বাস্তবতায় স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি কিছুটা সহায়তা দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, গভীর সমুদ্র গবেষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু গ্যাস নেই—এই বৈপরীত্যই আওয়ামী লীগ আমলের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
৪৮ ঘণ্টা পেরোলেও বিসিবির শোকজে নীরব নাজমুল

৪৮ ঘণ্টা পেরোলেও বিসিবির শোকজে নীরব নাজমুল