বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ থেকে দুই কোটি টাকা ঘুস নেওয়ার সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্য পেয়েছে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, অবসরের পর তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ মাস চাকরি করেন এবং নিয়মিত বেতন ও সুযোগ–সুবিধা গ্রহণ করেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
এস এম মনিরুজ্জামান ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ দখলে নেয় এস আলম গ্রুপ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই দিন সন্ধ্যার পর অনুমোদনের চিঠি এলেও গভীর রাত পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বসিয়ে রেখে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। মনিরুজ্জামান ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেপুটি গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিরুজ্জামানের নামে ১১টি ব্যাংকে মোট ১৫৯টি হিসাব পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৫৩টি এফডিআর, চারটি সঞ্চয়ী হিসাব ও দুটি ক্রেডিট কার্ড হিসাব। এসব হিসাবে মোট জমা হয়েছে প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং উত্তোলন হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ হিসাবে স্থিতি ছিল আনুমানিক ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
দুই কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন
সবচেয়ে আলোচিত লেনদেনটি হয় ২০২১ সালের আগস্ট মাসে। ১৭ আগস্ট ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের গুলশান সার্কেল–১ শাখায় মনিরুজ্জামানের নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। মাত্র দুই দিন পর, ১৯ আগস্ট ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের জুবলি রোড শাখায় এস আলম ভেজিটেবল অয়েল নামে পরিচালিত একটি হিসাব থেকে মনিরুজ্জামানের অনুকূলে দুই কোটি টাকার একটি পে–অর্ডার ইস্যু করা হয়। ২৪ আগস্ট সেই অর্থ ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা হয় এবং একই দিনে তিনটি এফডিআর খোলা হয়।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ অর্থ কোনো বৈধ বাণিজ্যিক চুক্তি, সেবা বা লেনদেনের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো নথি বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে সাবেক ডেপুটি গভর্নরের হিসাবে এই অর্থ জমাকে অত্যন্ত সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অবসরের পর এস আলম গ্রুপে চাকরি
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দুই কোটি টাকার লেনদেনের প্রায় তিন মাস পর এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার কোম্পানি থেকে মনিরুজ্জামানের হিসাবে নিয়মিত অর্থ জমা হতে শুরু করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, অবসরের পর তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং প্রায় ২৭ মাস চাকরি করেন। এ সময়ে বেতন বাবদ তার হিসাবে জমা হয় প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ আরও প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
বিএফআইইউর মতে, ডেপুটি গভর্নর থাকাকালে এস আলম গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। এর বিনিময়ে তাকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ও পরবর্তী সময়ে চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়।
স্ত্রী–সন্তানদের হিসাবেও বড় অঙ্কের লেনদেন
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, মনিরুজ্জামানের স্ত্রী নাদিরা আক্তারের নামে তিনটি ব্যাংকে আটটি হিসাব এবং সন্তানদের নামে তিনটি ব্যাংকে সাতটি হিসাব রয়েছে। এসব হিসাবে মোট জমা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং উত্তোলন হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। লেনদেনের উৎস সম্পর্কেও সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অস্বীকার
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস এম মনিরুজ্জামান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে কোনো ঘুষ নেননি। তার দাবি, দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি সম্পত্তি তিনি এস আলম গ্রুপের কাছে বিক্রি করেছিলেন।
কসমিক ডেস্ক