দেশে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর চূড়ান্ত খসড়া অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান ও তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এর আগে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) অধীনে আলাদা একটি লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ গঠনের ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সাঈদ কুতুবের সভাপতিত্বে সোমবার (আজ) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অধ্যাদেশটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। তিনি এ বিষয়ে গঠিত ১১ সদস্যের কারিগরি কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন। বৈঠক শেষে খসড়াটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন পেলে এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হবে।
চূড়ান্ত খসড়া অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ আসবে ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা-শেয়ারমালিকদের কাছ থেকে এবং বাকি ৪০ শতাংশ দেবেন উদ্যোক্তারা। তবে ব্যাংকটি পরিচালিত হবে সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, মুনাফা সর্বোচ্চকরণ নয়—বরং দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে মূল লক্ষ্য।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে পরিচালনার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে এই ব্যাংক প্রয়োজন। তবে এই ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না; অর্থাৎ এর শেয়ার কেনাবেচা করা যাবে না।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের ১৭ মে এমআরএর নতুন ভবন উদ্বোধনের সময় ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণই ভবিষ্যতের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। এই ব্যাংক জামানত ছাড়াই আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঋণ দেবে এবং সামাজিক ব্যবসা বিস্তারে ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে দেশে এনজিওগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এমআরএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৮৩টি। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন ৩ কোটি ২৩ লাখ সদস্য, যাদের প্রায় ৯১ শতাংশ নারী। এ খাতে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।
তবে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি ব্র্যাক, আশা, টিএমএসএসসহ ১৭টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান যৌথ বিবৃতিতে দাবি করে, এ উদ্যোগ বিদ্যমান সমস্যার সমাধান না করে খাতে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে সিডিএফ চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার বলেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও পরিশোধিত মূলধন কম হলে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগ পেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে শুরুতে সীমিতসংখ্যক লাইসেন্স দিয়ে কার্যকারিতা যাচাই করার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত হবে।
কসমিক ডেস্ক