দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষ জনতার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩০৮ জন। তবে এসব ঘটনার অনেকগুলোর তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মব সহিংসতার এক মর্মান্তিক উদাহরণ দেখা যায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সদরঘাট এলাকায়। গত ৩১ অক্টোবর সেখানে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইলেকট্রিশিয়ান আনোয়ার হোসেন বাবু। নিহতের মা দিলরুবা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ছেলে কোনো চোর ছিলেন না। তাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি তার নিরপরাধ সন্তানের হত্যার বিচার দাবি করেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন চোর ছিলেন না। এ ঘটনায় মামলা হলেও জড়িত বেশির ভাগ ব্যক্তিই এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টেও সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটে। স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে এক ক্রেতাকে ঘিরে ধরে রেস্টুরেন্টের কয়েকজন কর্মচারী টানাহেঁচড়া ও মারধর করেন। আশপাশের লোকজন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গত শনিবার এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ দুটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো মব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ এর শিকার হচ্ছেন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের ঘটনায় ১২৮ জন নিহত হন। এর মধ্যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে প্রাণ হারান ৯৬ জন। পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে মব সহিংসতায় নিহত হন ১৯৮ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে নিহত হন আরও ১৪ জন।
একই সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও মব সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটে। জরিপ অনুযায়ী, সংখ্যালঘুদের ওপর ২১১টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৪৮৭টি বাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং ৮৮টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ১১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া ৪৭টি মন্দির ও মঠ এবং ১৯৪টি প্রতিমায় হামলার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন আহত ও পাঁচজন নিহত হন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে মানুষ অনেক সময় আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। তার মতে, গণপিটুনি আইন ও সামাজিক রীতির বাইরে একটি সহিংস ও অগ্রহণযোগ্য আচরণ। কখনো কখনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে কাউকে আঘাত বা হত্যার জন্যও এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মো. সাইদুর রহমান মনে করেন, মব সহিংসতার পেছনে পরিকল্পিত উসকানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, সরকারের উদাসীনতা থাকলে এ ধরনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে কাউকে হত্যা করা আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এ ধরনের সহিংসতা বাড়তে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে মব সহিংসতা বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে মব কালচারের দিন শেষ। একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাব কাজ করছে এবং মব সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে হলে দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজে আইনের প্রতি আস্থা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা তৈরির ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
কসমিক ডেস্ক